শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তদন্তের নির্দেশ, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করার পরও কোনো কিছুতেই থামছে না লোকসানে নিমজ্জিত ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক লিমিটেডের (আইএসএন) শেয়ার দাম বাড়ার প্রবণতা।

বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পর কোম্পানিটির শেয়ার দাম বাড়ার প্রবণতা আরও বেড়েছে। গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) শেয়ার দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে ইনফরমেশন সার্ভিস নেটওয়ার্ক লিমিটেড। গত সপ্তাহে কোম্পানির দর বেড়েছে ৪৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। শেয়ারটির সমাপনী মূল্য ছিল ১০৫.৭০ টাকা।

মুলত রিজার্ভ মাইনাস ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের শেয়ারে ভূত শীর্ষক দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণ সহ কয়েকটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশের পর পুঁজিবাজারে হইচই শুরু হয়েছে। মুলত আলাদিনের চেরাগের মতো পুঁজিবাজারের মাধ্যমেও রাতারাতি বড় লোক হওয়া যায়, সেই কল্পিত কথাই যেন সত্যি করে দেয়ার ব্রত নিয়েছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্ক লিমিটেড (আইএসএনএল)। মুলত কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পুঁজিবাজারে আইএসএনএল শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে।

এমনকি কোন কিছু না জেনেই কৃত্রিম ক্রেতার ফাঁদে পড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সহজ সরল বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানিটির রিজার্ভ মাইনাস থাকলেও মাত্র ১৫ কার্যদিবসে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। মুলত এ শেয়ারটি নিয়ে কারসাজির অভিযোগ রয়েছে শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের বিরুদ্ধে। যার প্রথম অক্ষর ‘ই’। ইতিমধ্যে ঐ হাউজটি একের পর এক শেয়ার নিয়ে হরহামেশা কারসাজি করে যাচ্ছে।

অবশ্য শুধু শেষ ১৫ কার্যদিবস নয়, কোম্পানিটির শেয়ারের দাম তিন মাসের বেশি সময় ধরে বাড়ছে। অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে সতর্কবার্তাও প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও দাম বাড়ার প্রবণতা থামেনি। বরং লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বেড়েই চলছে। তিন মাসের মধ্যে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়েছে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৭ আগস্ট ইনফরমেশন সার্ভিসেসে নেটওয়ার্কের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৪২ টাকা ২০ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ২৭ আগস্ট লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৫ টাকা ৭ পয়সা। অর্থাৎ গত ১৫ কার্যদিবসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬৩ টাকা ৫০ পয়সা বা ১৩৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। শুধু গত ১৫ কার্যদিবস নয়, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিলের পর থেকেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ছে। গত ৩০ এপ্রিল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৩৩ টাকা ৭০ পয়সা।

অন্যভাবে বলা যায়, যদি কোনো বিনিয়োগকারী গত ৩০ এপ্রিল ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের ১০ লাখ টাকার শেয়ার কিনেন, তাহলে এখন তার বাজার মূল্য ৩১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৮ টাকা। এ হিসেবে ১০ লাখ টাকা খাটিয়ে সাড়ে তিন মাসেই মুনাফা পাওয়া গেছে ২১ লাখ ৩৬ হাজার টাকার বেশি। শেয়ার এমন দাম এবাবে বাড়া কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় লোকসান হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬৪ টাকা। এতে শেয়ার প্রতি ১৭ পয়সা লোকসান হয়েছ।

এদিকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে ২০২৩ সালে ১ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার খুব একটা ভালো না। এ যেন রূপকথার ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার মতো ঘটনা! শেয়ারের এমন দাম বাড়া কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের ব্যবসায় লোকসান হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬৪ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লোকসান হয়েছে।

২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে ২০২৩ সালে ১ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩ শতাংশ, ২০২০ সালে ১ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার খুব একটা ভালো নয়।

২০০২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। শেয়ার সংখ্যা এক কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৩টি। এর মধ্যে ২১ দশমিক ৪৭ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

ডিএসইর দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ার বিষয়টি নজরদারি করা হচ্ছে। শেয়ারের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কোনো অসংগতি থাকলে সে অনুযায়ী প্রতিবেদন তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে দেওয়া হবে।

যোগাযোগ করা হলে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ইনফরমেশন সার্ভিসেস নেটওয়ার্কের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখতে এরই মধ্যে ডিএসইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএসই বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখবে।