দেশ প্রতিক্ষণ, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে নগরীর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে এবং প্রাণহানি লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশের তিনটি প্রধান টেকটনিক প্লেট বার্মিজ ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশ মিয়ানমার (ইউরেশিয়ান) অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ায় এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়ম–নীতি না মেনে গড়ে ওঠা বিপুলসংখ্যক বহুতল ভবন, যা মাত্র ৬০ বর্গমাইলের পুরো নগরীকেই দারুণ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ফলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে মাত্র ৯৪টি ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ৯২ শতাংশ ভবন এখন ভূমিকম্প ও অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সিডিএ কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দরনগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এ কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভাঙতে বা অপসারণ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে চসিকের প্রকৌশল বিভাগের গাফিলতি রয়েছে। কিন্তু চসিকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে ওই ভবনগুলো ভাঙার কাজ তারা করতে পারেননি। চট্টগ্রামের নাগরিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে দুই সংস্থাই উদাসীন।

চট্টগ্রামে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরীর ১২টি ভবন হেলে পড়ে। ২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর নগরীর রৌফাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকায় একটি চারতলা ভবন হেলে পড়ে পাশের একটি পাঁচতলা ভবনের সঙ্গে গিয়ে ঠেকে। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। তা ছাড়া বিভিন্ন সময় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন হেলে পড়ার ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পে নগরীর ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদ মিয়াবাড়ি সড়কের ছয়তলাবিশিষ্ট স্টার ভবনটি হেলে পড়ে। অভিযোগ আছে, নগরীর অধিকাংশ ভবনই নির্মাণের সময় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানা হয়নি। মানা হয় না ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০২০। এসব ভবন নির্মাণের সময় ব্যবহার করা হয় না ভালো নির্মাণসামগ্রী।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য ও নগরবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি ২০০৯-১১ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রাম শহরে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৯২ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়বে; ৭৫ শতাংশ ফায়ার স্টেশন ধসে যাবে। অধিকাংশ হাসপাতাল ধসে পড়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়বে। অর্ধেকের বেশি গ্যাসলাইন ভেঙে যাবে। বিদ্যুতের অধিকাংশ খুঁটি ভেঙে যাবে। কয়েক লাখ মানুষ মারা যাবেন।

তিনি বলেন, গত এক যুগেরও বেশি সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রাম শহরে ভবনের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নির্মিত ভবনগুলো ঝুঁকিমুক্ত বলার সুযোগ নেই। ভূমির মালিক খরচ কমানোর জন্য এখনো ভালো প্রকৌশলী ও স্থপতি দিয়ে ভবন নির্মাণ করেন না।

আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোও সমানভাবে দায়ী। চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে নতুন করে জরিপের সময় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে নতুন করে ভবন নির্মাণ করতে মালিকদের শূন্য সুদে ঋণ দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অথরাইজড অফিসার প্রকৌশলী তানজীব হোসেন বলেন, সিডিএ অনেক সময় নিজে পরিদর্শন করে, আবার কখনো আশপাশের লোকজনের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে। তবে আইনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের ক্ষমতা সিডিএর নেই। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করার পর তা অপসারণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করা হয়। সিটি করপোরেশন চাইলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করতে পারে।

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস বলেন, ইতোমধ্যে নগরীর ৯৪টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে চসিককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চসিক প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে ভাঙার উদ্যোগ নেবে। গত শুক্রবার যে ভবনটি হেলে পড়ে সেটি নিয়েও আমরা চিঠি দিয়েছি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে আমরা আবারও কাজ শুরু করব।

এ ব্যাপারে চসিকের একজন প্রকৌশলী বলেন, অর্থের অভাবে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ করা কঠিন। সেখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙতে হলে অনেক টাকা খরচ করতে হবে। চাইলেও সহসা কোনো ভবন ভাঙার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।