, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা অয়েল কোম্পানি ‘উচ্চ ক্রেডিট ঝুঁকির’ মধ্যে পড়েছে। কারণ তাদের ১৯৩ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) পাঁচটি মারাত্মক তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকে আটকে আছে। ব্যাংকগুলো হলো: গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম চারটি ব্যাংক বর্তমানে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর ন্যাশনাল ব্যাংক উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে লোকসান গুনছে।

গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত কোম্পানির নিরীক্ষকরা তাদের মতামতে বলেছেন, পদ্মা অয়েল সেই ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগ নগদায়নের জন্য চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। কোম্পানির নিরীক্ষক এমএম রহমান অ্যান্ড কোম্পানি এবং মহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি মন্তব্য করেছে, ঝুঁকি বিবেচনা করে পদ্মা অয়েলের উচিত এই ক্রেডিট লস (ঋণ ক্ষতি) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।

তারা ঝুঁকি তুলে ধরে বললেও, নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন যে আর্থিক বিবরণীগুলি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড মেনে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কোম্পানির আর্থিক অবস্থার একটি সঠিক ও ন্যায্য চিত্র তুলে ধরেছে।

আর্থিক খাতের গবেষকরা বলছেন, এটি কোম্পানির দুর্বল কর্পোরেট গভর্নেন্স এবং দুর্বলতা আঁচ করতে পারার অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে। তারা যোগ করেন, ব্যাংকগুলো সংকটে পড়ার অনেক আগেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনার উচিত ছিল ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্য মোট ২২ কোটি ৩০ লাখ টাকার সুদের মধ্যে পদ্মা অয়েল ১৭ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি সুদ আদায় করতে পেরেছে, যার মধ্যে অগ্রিম আয়কর এবং আবগারি শুল্ক অন্তর্ভুক্ত।

আলম বলেন, এই অবরুদ্ধ তহবিল বা প্রতিপক্ষের ক্রেডিট লসের কারণে কোম্পানির তারল্যের অবস্থান সংকুচিত হতে পারে। ভবিষ্যতে ব্যাংক আমানত থেকে আয় কমে যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক এর একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা একত্রিত হয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক হবে।

চলতি অর্থবছর জুন মাস পর্যন্ত পদ্মা অয়েলের মোট ২৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১৯৮৬ কোটি টাকার এফডিআর ছিল। এর মধ্যে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকে ৫৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৩৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ১৬ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে ৬ কোটি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আটকে আছে।

পদ্মা অয়েলসহ রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণনকারী কোম্পানিগুলো প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশেও উল্লেখযোগ্য আয় বৃদ্ধি বজায় রেখেছে, যা মূলত সুদের হার বৃদ্ধির মধ্যে ব্যাংক আমানত থেকে অ-কার্যকরী আয় (হড়হ-ড়ঢ়বৎধঃরহম রহপড়সব) তীক্ষè ভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে।

পেট্রোলিয়াম পণ্যের উচ্চ বিক্রয় এবং ব্যাংক আমানত থেকে উল্লেখযোগ্য অ-কার্যকরী আয়ের ওপর ভর করে পদ্মা অয়েল অর্থবছর ২৫-এ ৫৬৩ কোটি টাকার রেকর্ড বার্ষিক মুনাফা অর্জন করেছে। অর্থবছর ২৫-এ এটি ৩৮ শতাংশ আন্তঃবার্ষিক মুনাফা বৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে। এই সময়ে অ-কার্যকরী আয় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৬০৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যেখানে কার্যকরী আয় ১০ শতাংশ বেড়ে ৬৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা হয়েছে।

রেকর্ড মুনাফার কারণে কোম্পানিটি অর্থবছর ২৫-এর জন্য তাদের সর্বোচ্চ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ১৬০ শতাংশ ঘোষণা করেছে, যা আগের বছরের ১৪০ শতাংশের চেয়ে বেশি। এরফলে বিনিয়োগকারীরা প্রতি শেয়ারে ১৬ টাকা ডিভিডেন্ড পাবেন এবং কোম্পানিটি তাদের ৫৬৩ কোটি টাকা বার্ষিক মুনাফা থেকে মোট ১৫৭ কোটি টাকা ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিতে ব্যয় করবে।

কোম্পানির মূল ব্যবসা বহির্ভূত মুনাফা বেশি ছিল কারণ এটি তার অর্জিত মুনাফার যতটা ডিভিডেন্ড হিসাবে বিতরণ করতে পারত, তা না করে মুনাফা ধরে রেখেছিল। এই পরিস্থিতিতে, যদি অবরুদ্ধ ব্যাংক আমানতের অর্থ ক্ষতি হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা মনে করতে পারেন যে অর্জিত মুনাফার অংশ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।