পুঁজিবাজারে ১৫ মাসেও আস্থা ফেরাতে পারেনি রাশেদ মাকসুদ কমিশন
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত মিললেও পুঁজিবাজারে চলছে এক অব্যাহত মন্দার ধারা। একদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকদের অনাগ্রহ সব মিলিয়ে বাজার যেন পতনের এক গভীর গহ্বরে নিমজ্জিত। ফলে টানা দরপতনে পুঁজিবাজার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বিনিয়োগকারীরা। ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের হাহাকার ততই বাড়ছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই লোকসান। যার ফলে পুঁজিবাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমনকি পুঁজিবাজার থেকে নীরবে প্রস্থান করছেন হাজারো বিনিয়োগকারী। দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, আস্থার সংকট এবং ভালো শেয়ারের অভাবে গত ১৫ মাসেই পুঁজিবাজার ছেড়েছেন বা নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন ৬২ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারী।
ফলে পুঁজিবাজারে গত ১৫ মাসেও আস্থা ফেরাতে পারেনি রাশেদ মাকসুদ কমিশন। গত বছরের ১৮ আগস্ট পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক কমেছে ১০৭৮ পয়েন্ট। মুলত রাশেদ মাকসুদ কমিশন যখন দায়িত্ব নেয় তখন ডিএসই সূচক ছিলো ৫৭৭৮.৬৩ পয়েন্ট। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৯১৪.৭২ পয়েন্ট। তবে নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ১২২ পয়েন্ট সূচকের বড় দরপতনে ডিএসইর সূচক এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭০২ পয়েন্ট।
‘অদ্ভুত’ এমন পুঁজিবাজার ৩০ বছরের ইতিহাসে দেখিনি যায়নি বলে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ বেড়েছে। তাছাড়া রাশেদ মাকসুদ কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ১৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং আস্থা বিনিয়োগকারীদের যেটুকু ছিল তাও সংকটে পড়েছে। ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ কমিশনের ওপর আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে এক গভীর আস্থার সংকটে ভুগছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাজারে চলমান অস্থির আচরণ ও টানা দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র ‘রক্তক্ষরণ’ চলছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা লোকসান মেনে নিয়েও যেকোনো মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন, যার ফলে দেশের পুঁজিবাজার যেন বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ‘আতঙ্কের নাম’ হয়ে উঠেছে।
এছাড়া বর্তমান পুঁজিবাজার ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ করছেন বিনিয়োগকারীরা। আর সেই অভিযোগের তীর সরাসরি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর দিকে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, লভ্যাংশ ও ইপিএসের মৌসুমে শেষ হলেও টানা দরপতন থামছে না। বিএসইসি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ না নিয়ে একের পর এক বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী বিতর্কিত পদক্ষেপ ও নির্দেশনা জারি করছে। যার ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা সংকটে ভুগছে বিনিয়োগকারীরা।
একাধিক বিনিয়োগকারীদের মতে, বাজারের বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী মূলত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের দুর্বল নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে অদক্ষতা। কারণ কমিশন বাজারকে স্থিতিশীল করার বদলে নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাজার আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত নীতিমালা পরিবর্তন, কিছু কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং বাজার সংস্কারের নামে নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মনে তৈরি হয়েছে গভীর আস্থার সংকট।
বাজার বিশ্লেষকদের ভাষায়, সূচকের এই পতন যেন ‘পুঁজিবাজারের কফিনে আরেকটি পেরেক’। বিগত দিনে এক কার্যদিবস সূচক সামান্য বাড়লেও পরের তিন কার্যদিবসে ঘটে বড় পতন। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা এখন চরমে পৌঁছেছে। লেনদেনের পরিমাণও দিন দিন কমছে, যা বাজারের স্থবিরতার আরেকটি সূচক। একসময় প্রতিদিন দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হলেও এখন তা নেমে এসেছে ৪০০ কোটিতে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুঁজিবাজার একটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিমত্তার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বাংলাদেশে এ খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারের বাইরে। অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে বাজারকে পুনর্গঠন বা আস্থার সংকট দূর করার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। দীর্ঘমেয়াদি নীতি সংস্কার, কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাস, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগবান্ধব আইন প্রণয়ন ছাড়া পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। কিন্তু বর্তমানে এসব বিষয়ে সরকারের মনোযোগ বা বাস্তব উদ্যোগের ঘাটতি প্রকট। ফলে টানা দরপতনের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকেই ক্ষতির ভয়ে নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সংস্কার মানে কেবল নিয়ম পরিবর্তন নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠন এবং বিনিয়োগ পরিবেশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় কমিশনের পদক্ষেপগুলো বাজারকে স্থিতিশীল করার বদলে অস্থির করে তুলছে বলেই অভিযোগ উঠছে। বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে ইতিবাচক বার্তা মিললেও পুঁজিবাজার যেন সেই ছোঁয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একসঙ্গে বসে বাজারের মৌলিক সমস্যা শনাক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য দরকার বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করা, গুজবনির্ভর লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা এবং কমিশনের কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানো।



