বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হাতিয়ে নেয়ার ‘নীলনকশা’র অভিযোগ
মোবারক হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রণীত ‘মার্জিন বিধিমালা-২০২৫’ কে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী এবং শেয়ার বাজার থেকে তাদের উচ্ছেদ করার এক গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি এ কে এম মিজান উর রশিদ চৌধুরী সম্প্রতি এই বিধিমালাকে ‘অবৈধ’ ও ‘প্রতারণামূলক’ দাবি করে একটি লিখিত অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। অভিযোগে বিএসইসি’র বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কম দামে হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
শেয়ার আত্মসাতের শঙ্কা: অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বিধিমালার ২নং ধারায় ‘আবশ্যিক বিক্রয়’ বা ফোর্সড সেল-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা নজিরবিহীন। পৃথিবীর কোথাও জোরপূর্বক কারো সম্পত্তি বিক্রির এমন আইন নেই। অভিযোগকারীর দাবি, এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হলো মার্জিন লোন অ্যাকাউন্টে থাকা শেয়ারগুলো বিক্রি করতে বাধ্য করা, যাতে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম কমিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান ও তার সিন্ডিকেট কম দামে সেই শেয়ারগুলো কিনে নিতে পারেন। প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক- নতুন এই বিধিমালা দেশের প্রচলিত ‘অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩’ এবং ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়: মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনস্থ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সুদ মওকুফ বা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিতে পারে। অথচ বিএসইসি’র নতুন বিধিমালায় গ্রাহকের সুদ মওকুফ বা সময় বৃদ্ধির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন-১৯৯৩ এর ৮ ধারায় কমিশনকে শেয়ার বিক্রির নির্দেশ দেওয়ার বা ঋণ আদায়ের কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
গৃহিণী ও শিক্ষার্থীদের বাজার থেকে বিতাড়নের কৌশল: বিধিমালার ৬(১) ধারাকে ‘চরম বৈষম্যমূলক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে—আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ছাত্র-ছাত্রী, গৃহিণী বা অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মার্জিন ঋণ দেওয়া যাবে না। অভিযোগকারীর মতে, বর্তমানে বাজারে বিপুল সংখ্যক নারী ও অবসরপ্রাপ্ত বিনিয়োগকারী রয়েছেন। এই আইনের মাধ্যমে তাদের মার্জিন ঋণ নবায়ন বন্ধ করে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য করা হবে, যা মূলত তাদের সম্পদ আত্মসাতের একটি কৌশল।
অবাস্তব শর্ত ও মার্জিন কল: বিধিমালার ৯নং ধারায় মার্জিন কল ও ইকুইটি মেইনটেইনেন্সের যে শর্ত ৭৫ শতাংশ জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ৯৯ শতাংশ বিনিয়োগকারীর পক্ষে পালন করা অসম্ভব। এছাড়া পোর্টফোলিও ভ্যালু ৫ লক্ষ টাকার নিচে হলে মার্জিন ঋণ না দেওয়ার যে বিধান (১১নং ধারা) রাখা হয়েছে, তাকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থপরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ ও দাবি-লিখিত বক্তব্যে এ কে এম মিজান উর রশিদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসি চেয়ারম্যান রাষ্ট্রের দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তারা ৬ মাস বা ১ বছরের জন্য এমন সব বিধিমালা তৈরি করেন যা দিয়ে সাধারণের শেয়ার হাতিয়ে নেওয়া যায় এবং পরে আবার তা বাতিল করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ব্যাংকগুলো প্রভিশন ঘাটতির কারণে লভ্যাংশ দিতে না পারলে সেই শেয়ারগুলোও মার্জিন অযোগ্য ঘোষণা করে ফোর্স সেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
বিনিয়োগকারীদের রক্ষার্থে এবং দেশের শেয়ার বাজারের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে এই ‘তর্কিত বিধিমালা’র বিষয়ে দ্রুত তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।



