আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র একের পর এক বেরিয়ে আসছে। উচ্চ খেলাপি ঋণের ভারে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে একাধিক ব্যাংক এখন খুড়িয়ে চলছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো: দুর্বল ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি আগে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণও লাফিয়ে বাড়ছে।

বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক পিএলসি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সুনাম, আস্থা ও ব্যবসায়িক সফলতার কারণে দেশের মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছে। ঋণ বিতরণ, আমানত সংগ্রহ, ঋণ আদায় ও প্রবাসী আয় সংগ্রহে ব্যাংকটি এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

তবে গত কয়েক বছরে ব্যাংকটিতে সংঘটিত ঋণ জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাচার হওয়া এসব অর্থ ফেরত না আসায় এক সময়ের শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক এখন খেলাপি ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়ে গেছে।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও। প্রভিশন সংকটের কারণে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডাররা দীর্ঘদিন ধরে কোনো লভ্যাংশ পাচ্ছেন না।

সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল এক লাখ ৮১ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি এখন অনাদায়ী, যা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) হিসেবেই ধরা হচ্ছে।

মাত্র এক বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮৮ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ছিল ১৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা (মোট ঋণের ১১ শতাংশ)। ব্যাংকটি এখন ৮৫ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকার প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) ঘাটতিতে আছে। লোকসান সামাল দিতে ব্যাংকগুলো যে নিরাপত্তা সঞ্চয় রাখে, সেখানে এমন বিশাল ঘাটতি ব্যাংকের ক্ষতির ব্যাপকতা দেখায়।

প্রায় সাত বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল এস আলম গ্রুপ। ২০১৭ সালে গোষ্ঠীটি ব্যাংকের মালিকানা ও সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার শুরু করার পর থেকেই ব্যাংকটি আর্থিকভাবে দুর্বল হতে থাকে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এস আলম গ্রুপ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও ছায়া কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন আয়ের ৯০ শতাংশ ইতোমধ্যেই পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে, যা স্পষ্টই বলে দেয় ঘাটতি পূরণে বিপুল অর্থ প্রভিশনে রাখা ব্যাংকটির পক্ষে সম্ভব নয়। ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে, ব্যাংকের মোট পরিচালন ব্যয় ছিল দুই হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, আর পরিচালন আয় তিন হাজার ৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরিচালন আয়ের ৯০.৯ শতাংশ পরিচালন ব্যয় মিটিয়েই শেষ, ফলে প্রভিশনের আগ পর্যন্ত মুনাফা থাকে মাত্র ৯.১ শতাংশ বা প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা।

এদিকে এস আলমের নিয়োগ করা কর্মীদের ছাঁটাই নিয়ে সম্প্রতি টাল-মাটাল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায় ব্যাংকটি। ইসলামী ব্যাংক এখন পর্যন্ত চার হাজার ৬৮৫ জন কর্মীকে বরখাস্ত করেছে। এই কর্মীদের এস আলম গ্রুপ যথাযথ-প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়োগ দিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। পরে ব্যাংকটি নতুন করে দুই হাজার ৫৭১ জন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ অডিটে দেখা গেছে, ব্যাংকের ২১ হাজার কর্মীর মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের পর। মানে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে। ব্যাংকের নথি বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেবল চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকেই সাত হাজার ২২৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চার হাজার ৫০০-এর বেশি নিয়োগ হয়েছে সাইফুল আলমের এলাকা পটিয়া থেকে।

ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসীম বলেন, ওই সময়ের প্রায় ১১ হাজার নিয়োগই ছিল অস্বচ্ছ। অনেক ক্ষেত্রে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়নি। তিনি জানান, যাদের নিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ছিল, তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যাংকটি সম্প্রতি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এক হাজার ৪০০ জন ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ), ৮০৬ জন মেসেঞ্জার-কাম-গার্ড এবং ৩৬৫ জন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

কয়েক দফায় চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধনও করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। বিষয়টি এখনো কোনো সুরহা হয়নি। গত বছরের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রুপটির প্রভাব থাকা বোর্ড ভেঙে দেয়।

এরপরই ব্যাংকের বহুদিনের গোপন ক্ষতি ও অনিয়ম একে একে প্রকাশ পেতে শুরু করে। শেয়ারহোল্ডার হিসাবও দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র সাত হাজার ৭২৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের চার দশমিক ৪২ শতাংশ। কিন্তু সরকারের পতনের এক মাসের মধ্যেই তা বেড়ে হয় ১৭ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা (১১ শতাংশ)। গত বছরের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয় ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা (২১ শতাংশ), আর চলতি বছরের মার্চ শেষে তা হয় ৪৭ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা (২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ)।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের একসময়কার সুনাম এখন ইতিহাস। করপোরেট গভর্ন্যান্সে দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি এসব মিলেই ব্যাংকটি গভীর সংকটে পড়েছে। তাদের মতে, জালিয়াতির মাধ্যমে যে অর্থ বেরিয়ে গেছে, তার বড় অংশই আর ফেরত আসবে না। ফলে ব্যাংকটির তারল্য সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।