আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: উচ্চ সুদের হার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট এই তিন চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার পরিণতিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে যে অর্থনৈতিক শ্লথগতি দেখা দিয়েছিল, তার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে স্পষ্টভাবেই। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বার্ষিক প্রকাশনা বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমিতে এই চিত্র উঠে এসেছে।

পণ্য উৎপাদনে খরচ বাড়লেও রপ্তানি মূল্য সেই হারে বাড়েনি। নতুন ক্রয়াদেশ (অর্ডার) পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। অনেক কারখানার পুরোনো অর্ডারও বাতিল হয়েছে। অনেকে শ্রমিকের বেতন-ভাতাসহ কারখানার নিয়মিত খরচ মেটাতে পুঁজি ভেঙে এখন পথে বসেছেন। লোকসানের ভার নিতে না পেরে অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। গত চার মাস দেশের রপ্তানি আয় কমেছে।

রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতেও শুল্ক-কর-ভ্যাটে ছাড় নেই। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো হয়নি। এলসি খোলাতেও কড়াকড়ি আছে। ডলারের উচ্চমূল্যে চাপে থাকা রপ্তানি খাত এখন বেহাল। তবে রপ্তানিতে মন্দাভাব সত্ত্বেও রপ্তানিকারকরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তারা রপ্তানি আয় বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কথা বলেছেন। এর জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। রপ্তানি খাতের আয় বাড়াতে সরকারের কাছে নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

একই মত জানিয়ে রপ্তানি হ্রাসের পেছনের কারণ হিসেবে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে দায়ী করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মোহাম্মাদ আজিজুল ইসলাম  বলেন, রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে রপ্তানিমুখী কোন খাতের কী সমস্যা তা পৃথকভাবে চিহ্নিত করে সমাধানে যেতে হবে। বিশেষভাবে পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং রপ্তানি সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি।

অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাস পার হয়েছে। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক থেকে বাঁচতে অনেকে আগেভাগে রপ্তানি করেছেন। এ জন্য ওই মাসে রপ্তানি আয় বাড়ে, যা দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র না। তবে পরের চার মাসে অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া গেছে। আগস্ট থেকে নভেম্বর পরের এই চার মাস টানা রপ্তানি আয় কমেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বিশ্বব্যাপী কাঁচামালের দাম বেড়েছে। দেশে উৎপাদিত কাঁচামালের দামও বেশি। কারখানা ভাড়া বেড়েছে। জ্বালানিসংকট চলছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

অনেকে সময়মতো ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। সুদ-আসল মিলিয়ে ব্যাংকের দেনা বেড়েছে। রাজস্ব পরিশোধের চাপ আছে। এ সবকিছুর সঙ্গে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি যোগ হয়েছে। এসব কারণে রপ্তানি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এখানে সরকারকে কিছু ছাড় দিতে হবে। সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। জ্বালানির দাম বেড়েছে। সরবরাহও যথেষ্ট না। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বিদেশি অর্ডার কমেছে। ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এত প্রতিকূলতার কারণে রপ্তানি খাতের অবস্থা ভালো না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান বের করা। না হলে রপ্তানি আয় বাড়ানো কঠিন হবে, যা সমগ্র অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ঠিকমতো পদক্ষেপ নিতে পারলে রপ্তানি আয় বাড়বে বলে আশাবাদী।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পণ্য রপ্তানির হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নভেম্বরে শীর্ষ পাঁচ রপ্তানি খাত ছিল– তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য ও হোম টেক্সটাইল। এর মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ছাড়া বাকিগুলোর রপ্তানি আয় কমেছে।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, গত নভেম্বরে ৩১৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কম।

রপ্তানি কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাড়তি শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে খরচ বেড়েছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এ জন্য দেশটিতে পণ্য রপ্তানিতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন না। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে। এ অস্থিরতার কারণে ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে অর্ডার কম আসছে।

তিনি বলেন, টানা চার মাস রপ্তানি কমেছে। তবে চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসের হিসাব যোগ করলে পোশাক রপ্তানি এখনো ইতিবাচক আছে। তার কারণ প্রথম মাসে বাড়তি শুল্ক এড়াতে অনেকে ওই মাসে বেশি রপ্তানি করেছেন। গত জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৬১৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। এ রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ বেশি। এ হিসাব রপ্তানির আসল চিত্র না।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ তৈরি পোশাকশিল্প খাত থেকে আসে। টানা চার মাস এ খাতে রপ্তানি আয়ে ধস নেমেছে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। রপ্তানি খাতে গতি আনতে হলে শুল্ক-কর-ভ্যাটের ছাড় দিতে হবে। রাজস্ব অব্যাহতি বাড়াতে হবে। ব্যাংকঋণের সুদের হার কমাতে হবে।

বন্দরের মাশুল কমাতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে হবে। তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত হচ্ছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। গত নভেম্বরে এ পণ্যের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯ কোটি ৮৯ মার্কিন ডলার। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত (জুলাই-নভেম্বর) ৫১ কোটি  ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, রপ্তানি আয় বাড়ার মূল কারণ কাঁচামাল। অন্য সবকিছুর দাম বেড়েছে। তবে কোরবানির ঈদের সময় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে রাখার কারণে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে পারব কি না, এমন অনিশ্চয়তায় অনেকে নতুন করে অর্ডার দিচ্ছে না। আগে দেওয়া অর্ডারও বাতিল করেছে।

দেশের তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে ব্যাপক ধস নেমেছে। গত মাসে রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ডলারের পণ্য। এ রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসের হিসাবেও রপ্তানি কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪৬ কোটি ডলারের পণ্য, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ কম।

চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানি খাত পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি গত মাসে সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান তাপস বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কাঁচা পাটের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট বেড়েছে। অনেক বেশি দাম দিয়ে কাঁচা পাট সংগ্রহ করতে হলে ব্যবসা করব কীভাবে? উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে।

বিদেশি ক্রেতারা অন্য দেশ থেকে যে দামে কিনছেন, আমরা সে দামে দিতে পারছি না। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে না পরলে রপ্তানি আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারকে এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। পঞ্চম শীর্ষস্থানীয় রপ্তানি খাত হোম টেক্সটাইলের রপ্তানিও কমেছে। গত নভেম্বরে রপ্তানি হয়েছে ৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল। এ রপ্তানি গত বছরের নভেম্বরের তুলনায় পৌনে ৮ শতাংশ কম।