বীমা খাতে আস্থা ফেরাতে আইডিআরএরের বড় সংস্কার
দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী সার্বিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেশের বীমা খাত গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সুশাসন জোরদার, আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় উন্নয়নের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বীমা খাতকে আধুনিক করার জন্য একটি সার্বিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে মোট ৭৫টি সংস্কার ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য স্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করছে। চলমান সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো বীমা গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একটি আস্থাপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও প্রযুক্তিনির্ভর বীমা বাজার গড়ে তোলা। আইডিআরএ এর সংস্কার কার্যক্রম তিন ভাগে ভাগ করেছে প্রশাসনিক সংস্কার, আইনি সংস্কার ও ডিজিটাল সংস্কার—যা বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বীমা খাতকে আরও কার্যকর ও আস্থাভিত্তিক করার জন্য আইনি সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বীমা আইন, ২০১০ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১০ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর, সময়োপযোগী, অংশীজনবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
একই সঙ্গে বীমাকারীর রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্বল বা সংকটাপন্ন বীমা প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষিত করা যাবে এবং পলিসি হোল্ডারদের স্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পেশাগত মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ চার্টার্ড ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউট অধ্যাদেশ, ২০২৬ এবং বাংলাদেশ অ্যাকচুয়ারি অধ্যাদেশ, ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এগুলো বীমা খাতে পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া সলভেন্সি মার্জিন, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, করপোরেট গভর্ন্যান্স, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ, এজেন্ট, জরিপকারী ও উপদেষ্টা সংক্রান্ত একাধিক বিধি ও নির্দেশিকা সংশোধন বা নতুনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় বীমা নীতি, ২০১৪ পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে নতুন ‘জাতীয় বীমা নীতি, ২০২৫-৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব আইনি সংস্কারের মাধ্যমে লাইফ ও নন-লাইফ উভয় বীমা খাতের আর্থিক সক্ষমতা, জবাবদিহি ও পেশাগত মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এগুলো বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী করবে।
আইডিআরএ’র সংস্কারের একটি বড় অর্জন হলো ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে অগ্রগতি। রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স গাইডলাইন্স, ২০২৩ সংশোধন এবং রেগুলেটরি ও সুপারভাইজরি টেকনোলজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক তদারকি এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বেড়েছে।
পুরনো ইউনিফায়েড মেসেজিং প্ল্যাটফর্মকে উন্নীত করে ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এটি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম হিসেবে কাজ করছে। এই সিস্টেমের আওতায় পলিসি হোল্ডার পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ, এজেন্ট লাইসেন্সিং, ই-কেওয়াইসি, ইলেকট্রনিক রিপোর্টিং, সেন্ট্রাল ডেটা ওয়্যারহাউস এবং বিজনেস ইন্টেলিজেন্সসহ বিভিন্ন সেবা একীভূত করা হয়েছে। এর ফলে সেবা প্রদান, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণকারীদের প্রবেশগম্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি ২০২৬ সালে আইডিআরএ, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স একাডেমি, সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশনে চালু হবে। অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের আধুনিকায়নের জন্য ইআরপি সিস্টেম, ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ডিজাস্টার রিকভারি অবকাঠামো, সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (এসওসি) এবং ডিজিটাল পে-রোল ও অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সুশাসন নিশ্চিত করতে আইডিআরএ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং পারস্পরিক প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করতে বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য গ্রেডিং ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে নিরীক্ষা ও পরিদর্শন কার্যক্রমও শক্তিশালী করা হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক দায় মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নিরীক্ষা পরিচালনা করা হচ্ছে।
মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে মানসম্মত চেকলিস্ট ও পুলভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে, যাতে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) আবেদনের প্রেক্ষিতে নন-লাইফ সেক্টরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কমিশন প্রথা স্থগিত করা হয়েছে। পলিসি হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করতে আইডিআরএ অফসাইট সুপারভিশন জোরদার করেছে।
পাশাপাশি ডিজিটাল বীমা দাবি নিষ্পত্তি অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়নের কাজ চলছে। গ্রাহকদের অভিযোগ ও জিজ্ঞাসা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষায়িত কল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিগুলোও পুনর্গঠন করা হয়েছে। এছাড়া ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশন (এনসিআইএস) সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে সব বীমাকারী একই প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হবে এবং দুর্নীতি, সম্পদ আত্মসাৎ ও অন্যান্য অনিয়ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।



