সিঙ্গার বাংলাদেশের লোকসান প্রায় ২২৫ কোটি টাকা, বিএসইসির তদন্তের দাবী
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশের সমাপ্ত অর্থবছরে নো ডিভিডেন্ড ঘোষণায় শেয়ারহোল্ডারা হতাশ হয়েছে। কোম্পানিটি সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে নিট লোকসান হয়েছে ২২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। তবে হঠাৎ কোম্পানিটির এত বড় লোকসান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ যেখানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বড় মুনাফায় সেখানে সিঙ্গার বাংলাদেশের টানা দুই বছরের লোকসান নিয়ে রহস্য দেখা দিয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে গোঁজামিলের অভিযোগ উঠেছে।
তাই বিনিয়োগকারী তথা পুঁজিবাজারের স্বার্থে কোম্পানিটিকে বাঁচানোর জন্য তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে মনে করছেন তারা। কারণ এর আগে তালিকাভুক্ত যত কোম্পানি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে সবগুলোই অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিঙ্গার বাংলাদেশের ভেতরে অর্থ লুটপাট হচ্ছে কিনা বা তলাবিহীন ঝুঁড়ি হয়ে গেছে কিনা সে বিষয় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বিএসইসি অনিতিবিলম্বে তদন্ত করা দরকার বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
মুলত সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে নিট লোকসান হয়েছে ২২৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে কোম্পানিটির নিট লোকসান ছিল ৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালের বড় লোকসান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কোম্পানির প্রতিবেদন অনুসারে, লোকসানের কারণে সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি সিঙ্গার বাংলাদেশের পর্ষদ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২২ টাকা ৫৬ পয়সা, আগের হিসাব বছওে লোকসান ছিল ৪ টাকা ৯১ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ১ টাকা ৬৯ পয়সায়। কোম্পানিটি জানিয়েছে, সুদহার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধি, প্রত্যাশার তুলনায় কম চাহিদা ও টাকার বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত কারণে নিট লোকসান বেড়েছে।
সমাপ্ত ২০২৫ হিসাব বছরে সিঙ্গার বাংলাদেশের আয় ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়লেও গ্রস প্রফিট ২ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো যায়নি। এছাড়া কর্মীদের প্রমোশন, বেশি ছাড় মুনাফা কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। গত বছরের তুলনায় কোম্পানিটির পরিচালন ব্যয় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, ফলে পরিচালন মুনাফা কমেছে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
এছাড়া ঋণের ওপর সুদ ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ১৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। নতুন কারখানায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ ব্যয় যুক্ত হওয়া, স্বল্পমেয়াদি ঋণ বৃদ্ধি এবং ইউরোর বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে। ফলে আলোচ্য হিসাব বছরে সিঙ্গার বাংলাদেশের বড় লোকসান হয়েছে।
৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে সিঙ্গার বাংলাদেশের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৪ টাকা ৯১ পয়সা। আগের হিসাব বছরে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৫ টাকা ২৪ পয়সা।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ২৫ টাকা ৮১ পয়সায়। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে সিঙ্গার বাংলাদেশের ইপিএস হয়েছে ৫ টাকা ২৪ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৭৩ পয়সা।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৩৪ টাকা ৩ পয়সায়। ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৭৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৫ টাকা ২০ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়ায় ২৯ টাকা ৯৭ পয়সায়।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান ছিলো ৪ টাকা ৯১ পয়সা। তবে আগের বছর কোম্পানিটির মুনাফা ছিলো ৫ টাকা ২৪ পয়সা।
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩ হিসাব বছরে বিনিয়োগকারীদের ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৫ টাকা ২৪ পয়সা, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ৭৩ পয়সা। গত ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৩৪ টাকা ৩ পয়সায়, যা আগের হিসাব বছরে ছিল ২৯ টাকা ৯৭ পয়সা।
সমাপ্ত ২০২২ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। আলোচ্য হিসাব বছরে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ৭৩ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ৫ টাকা ২০ পয়সা। ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়ায় ২৯ টাকা ৯৭ পয়সায়, আগের হিসাব বছর শেষে যা ছিল ৩৪ টাকা ৬ পয়সা।
সমাপ্ত ২০২১ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয় সিঙ্গার বাংলাদেশের পর্ষদ। ২০২০ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদে ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল সিঙ্গার বাংলাদেশ। এ সময়ে ইপিএস হয়েছিল ৮ টাকা ৬ পয়সা। ২০১৯ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ৭৭ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল প্রকৌশল খাতের বহুজাতিক কোম্পানিটি। এছাড়া ২০১৮ হিসাব বছরে ৩০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল তারা।
১৯৮৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিঙ্গার বাংলাদেশের অনুমোদিত মূলধন ২৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৯৯ কোটি ৭০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১৫৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৯৭ লাখ ২ হাজার ৮৩৮। এর ৫৭ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৯ দশমিক ৮২ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ১৩ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
প্রথম পাতা ৩ কলাম



