শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠৈছে। কোম্পানিটি ঋণ ছিল ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১২৬ কোটি টাকার তথ্য গোপন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, গোপন করা ঋণের এই টাকা রিটেইন্ড আর্নিং বা সংরক্ষিত আয় হিসাবে দেখিয়েছে।

এছাড়া কোম্পানিটি ২০২৫ সালের ৩০ জুন পূঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ২৪ লাখ টাকায়। কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ হিসাববছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করে এমন অনিয়ম পেয়েছেন নিরীক্ষক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাববছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছেন ইসলাম কাজী সফিক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্টসের পার্টনার মো. আবদুর রহমান, এফসিএ। নিরীক্ষক তার মতামতে জানিয়েছেন, কোম্পানিটি ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাববছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাংক ঋণের তথ্য গোপন করে রিটেইন্ড আর্নিং হিসাবে দেখিয়েছে।

রিটেইন্ড আর্নিং হলো কোম্পানির নিট আয় বা লাভ, যা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ না করে ব্যবসায় ধরে রাখা হয়। নিরীক্ষক জানান, ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাববছরে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের মোট তহবিল ছিল ৪৪৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ তহবিল ছিল ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা । সেই হিসেবে ঋণ তহবিল কোম্পানিটির মোট তহবিলের ৬৯ শতাংশ; কিন্তু কোম্পানি এসব ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো তহবিলের ব্যবস্থা রাখেনি।

আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং ওয়ান ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নিয়েছে অলটেক্স। প্রতিবেদনে ঋণের পরিমাণ ৩০৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা দেখানো হলেও ব্যাংকগুলোর দেয়া তথ্য বলছে, সুদাসলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে তাদের পাওনা আরও বেশি। নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ সোনালী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক এবং ওয়ান ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ ও ঋণের সুদ কম দেখিয়ে তা কর-পূর্ব মুনাফা এবং সংরক্ষিত আয় হিসাবে দেখিয়েছে, যার পরিমাণ ১২৫ কোট ৮৬ লাখ টাকা।

অলটেক্স তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে ৩৩ কোটি ২৮ লাখ ঋণের সুদ মওকুফ হিসাবে দেখিয়ে ওই টাকা মালিকানা স্বত্ব হিসেবে সমন্বয় করা হয়েছে। যদিও নিরীক্ষার সময় ঋণের সুদ মওকুফের কোনো নথিপত্র দেখাতে পারেনি কোম্পানিটি। মালিকানা স্বত্ব হিসেবে সমন্বয় করলেও এ টাকা ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত বছরের জন্য আয় বিবরণীতে অন্যান্য আয় হিসাবে দেখানো হয়নি।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৫ হিসাববছর শেষে সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিস ব্রাঞ্চে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ঋণ রয়েছে ২২৭ কোটি ৫২ লাখ ৩৭ হাজার ৬০৩ টাকা। কোম্পানিটি ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ঋণের সুদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করেনি। সোনালী ব্যাংক ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ব্যাংক স্টেটমেন্ট অনুসারে ঋণের ওপর সুদ নেয়নি।

যদি কোম্পানি ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ব্যাংকের অনুমোদনপত্র অনুসারে ১০ শতাংশ হারে ঋণের ওপর সুদ ধার্য করে, তাহলে মোট সুদ দাঁড়াবে আনুমানিক ২২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অলটেক্স এ টাকা ঋণের পরিমাণ থেকে কম দেখিয়ে কর-পূর্ব মুনাফা হিসেবে দেখিয়েছে। উল্লেখ্য সোনালী ব্যংকে এ সময়ে কোম্পনিটির জমা ছিল ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৫৪ টাকা।

প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ঋণ এবং সুদ বাবদ ব্যাংকটি পাওনা ৯৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। কারণ ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে সমাপ্ত বছরের জন্য কোম্পানি ঋণের সুদ হিসাবে ৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা প্রভিশন রাখেনি। এই অর্থ কোম্পানির সংরক্ষিত আয় হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে প্রাইম ব্যাংক থেকে এ পরিমাণ ঋণ কম দেখানো হয়েছে।

ওয়ান ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে নেয়া ৬২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ঋণের সুদ প্রভিশন রাখা হয়নি। এতে ৩০ জুন ২০২৫ তারিখে কোম্পানির রক্ষিত আয় ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে এবং ওয়ান ব্যাংকের ঋণ কম দেখানো হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে দেয়া ঋণের পরিমাণ ও ব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মধ্যে গরমিলের ব্যাপারে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এম এ মহসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

নিরীক্ষককের মতামতের ব্যাপারে জানতে চাইলে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের কোম্পানি সচিব জিয়াউল হক বলেন, নিরীক্ষক আর্থিক প্রতিবেদনে মতামত দেয়ার স্বাধীনতা রাখেন। নিরীক্ষককে আর্থিক প্রতিবেদনে মতামত দিতে হয় তাই দিয়েছেন। আমাদের কিছু ঋণ আছে অনেক আগের। সেগুলোর সব তথ্য সঠিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করেছি।
১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৫৫ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোম্পানিটির পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৫৫ এবং ৪৯ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ার। সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাববছরে বিনিয়োগকারীদেও নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কারণ আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৮ পয়সা, যা আগের হিসাববছরে যা ছিল ১ পয়সা।

৩০ জুন ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ২৪ টাকা ৭৭ পয়সা। সর্বশেষ ২০২১-২২ হিসাববছরে বিনিয়োগকারীদের ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। ওই সময়ে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ইপিএস হয়েছিল ২০ পয়সা।