অর্থমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে রেজা কিবরিয়া ও আমীর খসরু
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলের এই জয়ে স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পর সরকারের গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে আর্থিক খাতে আওয়ামী লীগের লুটপাটের পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুরুদ্ধারের জন্য বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে দেশে ও দলের অভ্যন্তরে জোরগুঞ্জন শুরু হয়েছে। বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন: প্রয়াত সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ড. রেজা কিবরিয়া হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বেসরকারিভাবে বিএনপির প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া ১ লাখ ১১ হাজার ৭৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম (রিকশা প্রতীক) পেয়েছেন ৫৫ হাজার ২৪৫ ভোট। ড. রেজা কিবরিয়া সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান। নির্বাচনের কিছুদিন আগে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম এবং বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শিক্ষাজীবনে ড. রেজা কিবরিয়া বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড ও কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার পাশাপাশি অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন। চাকরি জীবনে তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০০১ সাল থেকে ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আমীর খসরু ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্টলীতে জš§গ্রহণ করেন। আমীর খসরু ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শিক্ষাজীবন শেষ করে তার পিতার ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) প্রতিষ্ঠাতা এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া খসরু চট্টগ্রামে দক্ষিণ কোরিয়ার অনারারি কনসাল, সোনালী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ শিল্প বিভাগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ও কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘুরে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে আগামীতে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী কে হবেন জানতে চাইলে, দলটির একাধিক নেতা উপরোক্ত তিন অর্থনীতিবিদের নাম উল্লেখ্য করেন। যদিও এর বাইরেও কয়েকজনের নাম রয়েছে। যারা এর আগে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২০ টাকা ধরে স্থানীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৮ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
বিরোধী রাজনৈতিক দল, অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি করছেন: ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, অবকাঠামো প্রকল্প এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রভাবশালী মহলের ঋণ নিয়ে তা খেলাপি হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদ ও সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংক খাত ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চরম আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নাম দিয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি এক্সিম ও স্যোশাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতির ঘটনাও আলোচনায় রয়েছে। বাজার-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী গোষ্ঠী কৃত্রিমভাবে শেয়ারদর বাড়িয়ে পরে তা বিক্রি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নির্বাচনের আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকার পুঁজিবাজারকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ক্ষমতায় এলে তারা পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগকারীবান্ধব করবেন।
অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের ব্যয় একাধিকবার সংশোধন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসন ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি সমালোচকদের।
তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তাদের দাবি, আর্থিক খাতে সংস্কার ও ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করার ফলে অনিয়ম অনেকটাই কমেছে। সার্বিকভাবে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



