নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই গতি ফিরবে অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে
আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সব ধরনের শঙ্কা কাটিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ও মন্ত্রীসভা গঠন করবে। বিএনপির একটি বড় সুবিধা হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল, যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে। এই দলে যেমন আছেন অনেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ তেমনি আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা, থিংকট্যাংক, পেশাদার এবং আধুনিক মনা মানুষ।
ফলে দেশে কার্যকর বন্ড মার্কেট স্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ছেড়ে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। কারণ ডলার সংকট কতটা কেটেছে এবং কী অবস্থায় আছে, তা আমরা সঠিকভাবে জানি না। দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং সরকারের কড়াকড়ির কারণে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলে এই রিজার্ভের পরিমাণ পর্যাপ্ত কি না, সেটি ভালোভাবে নিরূপণ করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে।
এছাড়া দেশের মুদ্রাবাজার, ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার নিয়েও খুব দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বসে আছে। ঋণের ওপর সুদহার অনেক বেশি, যা ক্ষেত্রবিশেষ ১৫ শতাংশ বা তার বেশি। এত উচ্চহারে সুদ দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যবসা করে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এ রকম একটি কঠিন আর্থিক সমস্যার মধ্যে আছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে ঋণের ওপর সুদহার হ্রাস করা। এ কথা ঠিক যে সুদহারের সঙ্গে অর্থনীতি ও মুদ্রানীতির অনেক বিষয় জড়িত আছে, যা বিবেচনায় নিয়েই সুদহার হ্রাসের কাজে হাত দিতে হবে।
তেমনি পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। এ অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন মেলেনি। ফলে চলতি বছরে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে সূচক, লেনদেন, মূলধন কমেছে। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু সাধারণ বিনিয়োগকারী। সার্বিকভাবে চরম অস্থিরতার মধ্যে অন্তবর্তীকালীন সরকারের ১৭ মাস পুঁজিবাজার পার করছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচলে শুরু হচ্ছে নির্বাচিত সরকারের আমলের পুঁজিবাজার। এ বছর স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে পুঁজিবাজারে গতিশীল করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আশা করা যায় নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। সেই সঙ্গে পুঁজিবাজারেও গতি ফিরে পাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচিত সরকারের আমলে গতিশীল পুঁজিবাজার চান বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে, হারানো পুঁজি ফিরে পাবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল আমিন বলেন, নির্বাচিত সরকারের হাত ধরেই দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে গতি ফিরবে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির ইশতোহারে পুঁজিবাজার নিয়ে সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা আছে। সেদিক বিবেচনায় নির্বাচিত সরকারের হাত ধরে পুঁজিবাজারবান্ধব হবে বলে আমার বিশ্বাস। কারণ যদি সেটা বাস্তবায়ন না হয়; তাহলে সোশ্যাল প্রেসার থাকবে। ইতোমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগে ফিরেছেন। আবার অনেকেই এখন বিনিয়োগ করবেন বলে অপক্ষোয় আছেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে মনে করছি, এখন পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। আশা করি, বিএনপি সরকার অবশ্যই পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কাজ করবে। তবে বিএনপি ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, নির্বাচনপরবর্তী তা যদি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। আমাদের পুঁজিবাজার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই আমরা আশা করি বিএনপি সরকারের হাত ধরেই পুঁজিবারের উন্নয়ন ঘটবে।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুঁজিবাজারের উন্নয়নে নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার যথাযথভাবে সম্পন্ন করা গেলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ফিরতে হবে। তারা বিনিয়োগে ফিরলেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো সম্ভব হবে। এতেই পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে তেমনি অর্থনীতিও চাঙা হবে।



