আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে ধীরগতিতে চলছে। কয়েক মাস ধরে বিদেশিদের পুঁজিবাজার ছাড়ার যে ধারা চলছে, তা এখনও থামেনি। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্যান্য খাতের মতো পুঁজিবাজারে আশার আলো দেখা যায়। নতুন করে আসতে শুরু করে বিদেশি বিনিয়োগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্ভাব্য সংস্কারের আশায় আসা এই বিনিয়োগে সাময়িকভাবে সক্রিয় হয় দেশের পুঁজিবাজার। ফলে আগস্টের পুরো সময় ইতিবাচক ধারা দেখা যায়।

তবে বেশিদিন অটুট থাকেনি এ ধারা। আগস্টে শুরু হওয়া বিনিয়োগ জানুয়ারিতে এসে ভাটায় পড়ে। বেশিরভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর থেকে বিদেশী বিনিয়োগে টানা ভাটা পড়েছে। মুলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আস্থা না থাকায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাজারবিমুখ হয়ে পড়েন।
মুলত ডলারসংকট, মুদ্রার বিনিময় হার অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমে এসেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বাজারের আকার বিবেচনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবির) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা বিবেচনা করে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিময় হার নিয়ে অস্থিরতা তাদের মধ্যে সতর্ক অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে নতুন করে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসছে না।

তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখেন। তবে তারা এখন ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ অবস্থানে আছেন। অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্থিতিশীল হলে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এ ছাড়া নির্বাচিত সরকার পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে কোন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাও বিবেচনা করবে।

বাজার বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল আমিন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হলে বাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে পূর্বাভাসযোগ্যতা থাকলে বিদেশিদের আস্থা বাড়বে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসইতে) তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব রয়েছে। বিদেশি মালিকানার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ৩৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এরপর রয়েছে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, যেখানে বিদেশি মালিকানা ৩২ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে বিদেশি মালিকানা ২৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসে ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মোট প্রায় ১২০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। একই সময়ে তাদের শেয়ার কেনার পরিমাণ ছিল মাত্র ৬০ লাখ টাকা। বিদেশি বিনিয়োগ কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টে। নভেম্বর মাসে কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানা ছিল ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা নেমে আসে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশে।

সিটি ব্যাংকেও বিদেশি মালিকানা কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকটিতে বিদেশি অংশ কমেছে শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ। এতে বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। গ্রামীণফোনে বিদেশি মালিকানা শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ থেকে কমে শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রায় ২৪ কোটি টাকার বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পছন্দের তালিকায় থাকা স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালেও বিনিয়োগ কমেছে।

ডিসেম্বরে কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানা নেমে আসে ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশে। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক, রেনাটা, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও যমুনা অয়েলেও বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে। তবে একই সময়ে প্রাইম ব্যাংক, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ন্যাশনাল ব্যাংকে বিদেশি মালিকানা সামান্য বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশি বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।

বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনাবেচায় নিট বিক্রির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় মূলধনি শেয়ারে তাদের লেনদেন তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে নতুন করে বড় বিনিয়োগ আসছে না। ডলার রেপাট্রিয়েশন বা মুনাফা বিদেশে পাঠাতে জটিলতা এবং বিনিময় হার ঝুঁকি বিদেশিদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতা খোঁজেন। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দেশীয় চ্যালেঞ্জ মিলিয়ে তারা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে কর কাঠামো সহজীকরণ, লভ্যাংশ ও মূলধনি মুনাফা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং বাজারে সুশাসন জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ভালো মানের নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি, বহুজাতিক ও বড় দেশীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। ডিজিটাল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার এবং প্রবাসী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা সহায়তা সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে। এ সময়ে বিদেশিরা ২০৩ কোটি টাকার বেশি লেনদেন করেছেন। তার আগের ১৫ দিনে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে ১৫ দিনের ব্যবধানে বিদেশি লেনদেন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পাক্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই কমছে। গত বছরেও এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ডিএসইতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ৩২ কোটি ডলার লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে গত বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল দেড় কোটি ডলার।

এরপর ফেব্রুয়ারিতে ২ কোটি ২০ লাখ, মার্চে ১ কোটি ৪০ লাখ, এপ্রিলে ৩ কোটি ৫০ লাখ, মে মাসে ৪ কোটি ১০ লাখ, জুনে ২ কোটি ৩০ লাখ, জুলাইতে ৪ কোটি, আগস্টে ৩ কোটি ১০ লাখ, সেপ্টেম্বরে ৩ কোটি ৬০ লাখ, অক্টোবরে ৩ কোটি, নভেম্বরে ২ কোটি ১৯ লাখ ও ডিসেম্বরে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলারের লেনদেন করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। এ সময়ে প্রতি মাসে গড়ে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার।

ডিএসইর তথ্যানুসারে, গত ৯ বছরে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণ ৩ দশমিক ৮৫ থেকে কমে ১ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মধ্যে চার বছর ধরে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। ২০১৬ সালে ডিএসইতে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা, যা ছিল এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

২০১৭ সালে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল বিদেশিদের, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ১১ হাজার ৪৪৮ কোটি। ২০১৮ ও ১৯ সালে ডিএসইতে বিদেশিরা যথাক্রমে ৯ হাজার ২৭৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন করেছেন এবং এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে তাদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৪৮ ও ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

কোভিডের বছর ২০২০ সালে পুঁজিবাজারে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা, যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০২১ সালে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণের হার নেমে যায় ১ দশমিক ১০ শতাংশে এবং টাকার অঙ্কে লেনদেন দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৬৪ কোটিতে। ২০২২ ও ২৩ সালে ডিএসইতে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

এ দুই বছরে এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনে বিদেশিদের অংশগ্রহণের হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৮৯ ও দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ সময়ে বিদেশিদের লেনদেনের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ হাজার ১৮০ কোটি ও ২ হাজার ১৬৭ কোটি। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ডিএসইতে বিদেশিদের লেনদেন কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ৯২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ছিল গত বছর এক্সচেঞ্জটির মোট লেনদেনের ১ দশমিক ২২ শতাংশ।

পুঁজিবাজারে ক্রমান্বয়ে বিদেশিদের বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণকে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে এমএসসিআই ফ্রন্টিয়ার মার্কেট সূচকের রিটার্নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে শ্লথগতির কারণে বিনিয়োগকারীরা বেশি রিটার্নের আশায় এখান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে অন্য অঞ্চলের বাজারগুলোতে বিনিয়োগ করেছেন।

পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, তারল্য ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার ঝুঁকি ও পর্যাপ্ত ভালো শেয়ারের জোগান না থাকার বিষয়গুলোও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।