সিটি ব্যাংকের অন্দরমহলে ‘লুটপাটের মহোৎসব’
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি সিটি ব্যাংক পিএলসিতে সুশাসন, নৈতিকতা ও জবাবদিহির ধারণা যেন কাগুজে স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব বিনিয়োগ নীতিমালার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তহবিল থেকে বেআইনি সুবিধা আদায় করেছেন ব্যাংকের তিন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) সহ প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা। এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এর তদন্ত প্রতিবেদনে।
তদন্ত অনুযায়ী, এই কর্মকর্তারা ব্যাংকের পোর্টফোলিওকে ব্যক্তিগত আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন ঝুঁকি গেছে ব্যাংকের ঘাড়ে, আর লাভে নিজেদের পকেট ফুলেছে। সিটি ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যও পেয়েছে। ব্যাংকের অংশীদার ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এর মনোনীত পরিচালক রয়েছেন।
হংকং-ভিত্তিক আর্থিক সাময়িকী ফাইন্যান্স এশিয়া ২০২৫ সালে সিটি ব্যাংককে ‘সেরা ব্যাংক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া, সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল ও সিটি ব্রোকারেজও তাদের ক্ষেত্রে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছে। গত নভেম্বরে ‘বাংলাদেশ সি-সুইট অ্যাওয়ার্ডস’ এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছেন।
কিন্তু এই বাহ্যিক খ্যাতি ও পুরস্কারের আড়ালে ব্যাংকের অন্দরমহলে ঘটে গেছে ভয়ংকর অন্যায়। বিএসইসির তদন্তে দেখা গেছে, তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ পাঁচজন কর্মকর্তা ব্লক মার্কেটে লেনদেনের মাধ্যমে ‘অন্যায় সুবিধা’ নিয়েছেন। তদন্তের সূচনা হয় সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল মার্কেট পোর্টফোলিও ম্যানেজার মো. সানোয়ার খান–কে ঘিরে। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আসমাউল হুসনা ২০২৩–২৫ সালের মধ্যে ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে নিজস্ব ও স্ত্রীর ইঙ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ‘কাউন্টারপার্টি ট্রেডিং’ এ লিপ্ত ছিলেন।
অর্থাৎ, ব্যাংকের পক্ষে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ক্রেতা হিসেবেও অবস্থান করছেন সুস্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত। বিএসইসির প্রতিবেদনে অগ্নি সিস্টেমস, ক্যাপিটেক জিবিএফ ইউনিট ও বিডি পেইন্টস এর শেয়ারে সংঘটিত লেনদেনগুলোকে ‘নজিরবিহীন’ বলা হয়েছে।
বিএসইসির পর্যবেক্ষণে আরও তিনজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাইফ উল্লাহ কাওছার, মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান ব্লক মার্কেটে সিটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মুনাফা করেছেন। তারা কম দামে শেয়ার কিনে, পরে ব্যাংকের কাছেই বেশি দামে বিক্রি করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ: সাইফ উল্লাহ কাওছার ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর ২৫ হাজার লাভেলোর শেয়ার ৯৭ টাকায় বিক্রি করেন, যেখানে বাজারদর ছিল ৯২.২০ টাকা। এক লাখ ২০ হাজার টাকার অবৈধ মুনাফা। ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৩.৫ লাখ শেয়ার ২৯.৮০ টাকায় বিক্রি করে ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা মুনাফা। মোহাম্মদ মাহমুদ গনি ও মো. আশানুর রহমান অনুরূপভাবে ব্যাংকের তহবিল থেকে লাখাধিক টাকা মুনাফা করেছেন।
বিএসইসির মুখপাত্র মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, সিটি ব্যাংকের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি এনফোর্সমেন্ট বিভাগে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, তহবিল অপব্যবহারে পদভেদে শাস্তি ভিন্ন হবে না।
আইন ভঙ্গকারী প্রত্যেককেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মাসরুর আরেফিন প্রথমবারের মতো এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং গত জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদের জন্য পুনর্নিয়োগ পান। তিন সপ্তাহ ধরে তার অধস্তনদের অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানাতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।



