দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পদগুলো ঘিরে আবারও তদবির শুরু হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, জালিয়াতি ও অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে এখন দরকার সৎ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব। নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের ইশতেহারে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তবে অংশীজনরা বলছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীদের স্বার্থসংঘাত আছে কি না এবং তারা কোনো গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সততা ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিশেষজ্ঞ জানান, একটি পক্ষ তার নাম প্রস্তাব করেছিল।

তবে তিনি আগ্রহ দেখাননি। তার মতে, অনেক সময় ভবিষ্যতে সুবিধা পাওয়ার আশায় এমন সুপারিশ করা হয়। তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের আগে সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ সিদ্দিকী বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি স্বার্থগোষ্ঠী থেকে দূরে ছিলেন বলেই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পেরেছেন। তবে নতুনদের ক্ষেত্রে অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করাও জরুরি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার খন্দকার রাশেদ মাকসুদ–কে চেয়ারম্যান করে এবং তিনজন কমিশনার নিয়োগ দেয়। সংস্থার ভেতরের কয়েকটি সূত্র বলছে, তার সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রায় সব কর্মকর্তার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করায় কাজের গতি কমে যায়। তার মেয়াদে জরিমানা ও বিধিমালা সংস্কারে জোর দেওয়া হলেও নতুন কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব অনুমোদন পায়নি।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, নতুন নেতৃত্বকে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশকে প্রান্তিক বাজার থেকে উদীয়মান বাজারে উন্নীত করা। অতীতের কিছু সিদ্ধান্তও বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৯ সালে জিয়াউল হক খন্দকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋণের বিপরীতে শেয়ার কেনাবেচায় শিথিলতা, অতিরিক্ত শেয়ার ইস্যু ও সম্পদের পুনর্মূল্যায়নের মতো সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করে। ২০১০-১১ সালের ধসের পর এম খায়রুল হোসেন চেয়ারম্যান হন। তার সময়ে অনেক কোম্পানি বাজারে আসে। সমালোচকদের দাবি, এর মধ্যে কিছু কোম্পানি পরে দুর্বল শেয়ারে পরিণত হয়।

উদাহরণ হিসেবে রিং শাইন টেক্সটাইল–এর ঘটনা আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া আর্থিক বিবরণী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আইপিও অনুমোদন পায়। পরে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগকারীদের অর্থ নিয়ে দেশ ছাড়েন। ২০২০ সালে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এর নেতৃত্বাধীন কমিশন করোনার সময়ে শেয়ারমূল্যের সর্বনিম্ন সীমা বহাল রাখে।

তখন কিছু ব্যক্তির প্রতি পক্ষপাত ও স্বার্থসংঘাতের অভিযোগ ওঠে। সরকার পতনের পর অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজকে চেয়ারম্যান করার আলোচনা থাকলেও তিনি দায়িত্ব নেননি। পরে খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিএসইসির ভেতরের সূত্রগুলোর মতে, কার্যকর নেতৃত্ব ছাড়া সংস্থাকে শক্তিশালী করা সম্ভব নয়। অতীতের অনিয়মে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সৎ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করলেই আস্থা ফিরবে। বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নতুন কমিশনে এমন ব্যক্তিদের আনা হবে, যারা দক্ষ, স্বার্থসংঘাতমুক্ত এবং চাপমুক্তভাবে কাজ করতে পারবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচন করা হয়, সেটিই এখন বাজারের মূল আলোচ্য বিষয়।