দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ব্যাংকাস্যুরেন্স-এর মাধ্যমে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসি নিতে পারবেন মাত্র ১০ মিনিটে। পুরোপুরি অটোমেটেড সিস্টেমে নির্ধারিত ব্যাংক থেকে পলিসি কেনা এখন আরো সুবিধাজনক ও নিরাপদ। ব্যাংকের শাখায় গিয়ে একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও বীমা সুবিধা পাওয়ার সুযোগকে তারা সময়োপযোগী ও সুবিধাজনক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।

রাজধানীর একটি শাখায় সেবা নিতে আসা এক গ্রাহক বলেন, আগে বীমা করতে আলাদা করে অফিসে যেতে হতো। এখন ব্যাংকিং কাজের পাশাপাশি বীমা পলিসি নেওয়া যাবে এতে সময় ও ঝামেলা দুটোই কমবে। আরেক গ্রাহকের ভাষ্য, ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা পণ্য পাওয়ায় আস্থাও বাড়বে, কারণ ব্যাংকের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। গ্রাহকদের অনেকে মনে করছেন, ব্যাংকের পরিচিত পরিবেশে বীমা সেবা পাওয়ার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বীমা সম্পর্কে আগ্রহ বাড়বে। বিশেষ করে সঞ্চয়ধর্মী ও সুরক্ষাভিত্তিক পলিসি সহজে গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থায় ব্যাংক করপোরেট এজেন্ট হিসেবে বীমা কোম্পানির পণ্য তাদের নিজস্ব ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলের মাধ্যমে বিপণন করবে। ফলে গ্রাহকরা একই প্ল্যাটফর্মে একাধিক আর্থিক সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ উদ্যোগ গ্রাহকসেবার মান উন্নত করার পাশাপাশি বীমা খাতে অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।

গ্রাহকদের প্রত্যাশা, এ সেবার মাধ্যমে দাবি নিষ্পত্তি ও তথ্যপ্রাপ্তি প্রক্রিয়াও হবে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত। ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগে একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পথ তৈরি হবে বলেও তারা আশাবাদী। মুলত সম্প্রতি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি ব্যাংকাসুরেন্স সেবা প্রদানে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

মুলত ব্যাংকাস্যুরেন্স একটি ফরাসি শব্দ। শব্দটি আমাদের অর্থনৈতিক অভিধানে নতুন সংযোজন। তবে কৌতূহল বা জানার আগ্রহ প্রবল। অন্যদিকে এটি নতুন ধারণা বিধায়, বাংলাদেশে বিষয়টি এখনো আশানুরূপ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পেশা এবং বাইরের মানুষের কাছেও ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। ‘কোনো বীমা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে ব্যাংক যদি তার গ্রাহকের কাছে ওই বীমা কোম্পানির পণ্য, তথ্যসেবা বিক্রি করে, সেটাই ব্যাংকাস্যুরেন্স।

ব্যাংকাস্যুরেন্সের ধারণাটির বাস্তব ভিত্তি বাংলাদেশে নতুন হলেও এর সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ব্যাংকাস্যুরেন্সের শুরুটা ১৮৬০ সালে। বেলজিয়ামের সিজিইআর সঞ্চয় ব্যাংক সর্বপ্রথম বন্ধকি-সংযুক্ত বীমা বিক্রি শুরু করে। প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় ফ্রান্সে ১৯৮০ সালে। মূলত তখন থেকেই এর ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। অতঃপর পশ্চিম ইউরোপের দেশ স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় এবং ধীরে ধীরে এর বড় বাজার গড়ে ওঠে।

একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, জার্মানিতেও এ ব্যবস্থার প্রসার ঘটে এবং মজবুত ভিত্তি পায়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ব্যাংকাস্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু হয় ২০০১ সালে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ পাকিস্তানেও ব্যাংকাস্যুরেন্স সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভারতে মোট বীমা পলিসির ২০ শতাংশ ব্যাংকাস্যুরেন্সের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ইউরোপের দেশ তুরস্কে এ হার ৮০ শতাংশ।

দেশে ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা পণ্য বিক্রির নতুন ব্যবস্থা ব্যাংকাস্যুরেন্স ধীরে ধীরে আলোচনায় আসছে। ২০২৪ সালের ১ মার্চ জাতীয় বীমা দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এখন ব্যাংকে গিয়ে যেমন আমানত বা ঋণের কাজ করা যায়, তেমনি একই জায়গা থেকে বীমা পলিসিও নেওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। লক্ষ্য ছিল ব্যাংক ও বীমা খাতকে একসঙ্গে এনে আর্থিক সেবা সহজ করা এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করা। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) অভিযোগ দেখার জন্য আলাদা ব্যবস্থাও রেখেছে।

ব্যাংকাস্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এক জায়গা থেকেই সব আর্থিক সেবা পাওয়া। গ্রাহককে আলাদা করে বীমা কোম্পানি বা এজেন্টের কাছে যেতে হয় না। নিজের পরিচিত ব্যাংক শাখা বা ডিজিটাল অ্যাপ ব্যবহার করেই পলিসি নেওয়া যায়। এছাড়া প্রিমিয়াম সরাসরি ব্যাংক হিসাব থেকে কেটে নেওয়া যায়; টাকা জমা হলেই মোবাইলে বার্তা আসে; কাগজপত্র ও দৌড়ঝাঁপ কমে; শর্তগুলো ব্যাংককর্মীরা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন; অনেক সময় বীমা এজেন্টের মাধ্যমে প্রিমিয়াম জমা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকত; এখন ডিজিটাল লেনদেন হওয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এজেন্টভিত্তিক খরচ কম থাকায় প্রিমিয়াম কিছুটা কম হতে পারে। আলাদা অফিস বা বড় নেটওয়ার্ক পরিচালনার ব্যয় ব্যাংকের ক্ষেত্রে নতুন করে লাগে না। ফলে গ্রাহক তুলনামূলক কম খরচে সেবা পেতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে বীমা খাতে আস্থার ঘাটতি ছিল। দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ও জটিলতার অভিযোগও ছিল। ব্যাংকের মাধ্যমে সেবা দিলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। এতে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরতে পারে।

বর্তমানে নন-লাইফ বীমায় প্রায় ১৫-২০ শতাংশ এবং লাইফ বীমায় ৮ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে বলে খাত–সংশ্লিষ্টরা জানান। প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়লে আগামী কয়েক বছরে এ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তে পারে। গার্ডিয়ান লাইফসহ বেশ কয়েকটি বীমা কোম্পানি ইতিমধ্যে ব্যাংকাস্যুরেন্সের আওতায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠিত ও সুনামধন্য কোম্পানিগুলো যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়ছে।