পুঁজিবাজারে অস্থিরতা কাটিয়ে আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ মন্দার পর দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেনের গতি কিছুটা বাড়লেও সূচক এখনো স্থিতিশীল হয়নি। তবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। মুলত গত ১৫ বছরের শাসনামলে পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজারের বড় অংশীদাররা নতুন আশার আলো দেখতে পান।
তাদের বিশ্বাস ছিল নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন ছিল। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। কারণ খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিশন ১৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর কারসাজি রোধে তৎপর হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা অনিয়মে হাজার কোটি টাকা জরিমানা করলেও বাজারে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে।
তবে মাঝে মধ্যে একটু সূচকের উকি মারলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। ফলে পুঁজিবাজার মূলধন সংগ্রহের জন্য হলেও নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৮ মাসে একটিও আইপিও বাজারে আসেনি, যা বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্টদের হতাশ করেছে। এই মাকসুদ কমিশন গত ১৮ মাস ধরে পুঁজিবাজারের উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সংস্কার করছে। তবে তারা যতই সংস্কার করছে, ততই পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এতে করে বর্তমান কমিশনের সংস্কার এরই মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অপসংস্কার হিসেবে ধরা দিয়েছে। যে কমিশন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কিছু করতে না পারলেও শুরু থেকে বিভিন্ন জনকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে বিএসইসিকে ‘শাস্তি কমিশন’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। তবে সবাইবে শাস্তি দিলেও ড. মুহম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির এক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাস্তি প্রত্যাহার করলেও তা বিষয়টি গোপন রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ফলে শাস্তি কমিশনের আড়ালে তিনি নিজেই কী ভাবে শাস্তি প্রত্যাহার করেন এ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল না করে বাজার সংস্কারের নামে অস্থিতিশীল করছেন।
ফলে ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়।
অবশ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ধ্বংসের দারপ্রান্তে।
এছাড়া সরকারের ঘোষিত সংস্কার পদক্ষেপগুলোও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে শেয়ারবাজার আরও নিম্নমুখী হয়, যার সরাসরি ক্ষতি ভোগ করতে হয় বিনিয়োগকারী এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ ধরে রাখতে দ্রুত ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা জরুরি। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি এবং বিনিয়োগকারীদের গভীর আস্থাহীনতার মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। এ প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না তা এখন একটি বড় প্রশ্ন। নির্বাচনের পর ৯ কার্যদিবসের মধ্যে ৩ কার্যদিবসে কিছুটা উত্থান হলেও ছয় কার্যদিবসই দরপতন দেখেছে।
তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএসইসির নেতৃত্বে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতির অভিযোগ ব্যাপকভাবে উঠেছিল। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউল হক খন্দকারের সময়ে বাজারে অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ বিতরণ, শর্ত উপেক্ষা করে রাইটস শেয়ার অনুমোদন এবং সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের মতো নানা অনিয়ম ঘটে। এরপর নিয়োগ পাওয়া দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সময়ে বিতর্ক ও সুশাসনের ঘাটতি আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এছাড়া ২০১১ সালে অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বে বহু দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়ে ‘জাঙ্ক’ শেয়ারে পরিণত হয়। রিং শাইন টেক্সটাইলের মতো প্রতিষ্ঠান ভুয়া আর্থিক বিবরণী দেখিয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) পায়। সেই সঙ্গে মূল্য নির্ধারণে ‘ফ্লোর প্রাইস’ চালু এবং বন্ধ মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বিতর্ক তৈরি করে।
২০২০ সালে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান থাকাকালীন ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই সময় বাজারে নিয়ন্ত্রণহীনতা ও স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রকটভাবে দেখা দেয়।
মিডওয়ে সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশিকুর রহমান বলেন, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে এবার যাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত। বহু বছর শিক্ষকদের দায়িত্ব দিয়ে দেখা গেছে বাজারে প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। বাজার-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ কাউকে দায়িত্ব দিলে তা ইতিবাচক ফল দেবে বলে আশা করি।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দুর করলেই বাজার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে। কারণ বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া পুঁজিবাজারে স্থায়ী গতি আসবে না। কারণ দীর্ঘদিন পুঁজিবাজারে অস্থিরতা থাকায় বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তবে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক সূচকগুলোর উন্নতির ওপর নির্ভর করে। এসব সূচকের মধ্যে রয়েছে সুদহার যৌক্তিকীকরণ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আনা, ইজ অভ ডুয়িং বিজনেসের র্যাংকিংয়ে উন্নতি, দেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সঠিক সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করা।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, নানা কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে ভালো কোনো কোম্পানি আসেনি। ভালো শেয়ারের জোগান না থাকায় বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বর্তমান পুঁজিবাজার চাঙা করতে হলে ভালো মৌল ভিত্তি কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা ও বিনিয়োগকারীদের মাঝে যে কোন মূল্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা।



