আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: এক সময় চাকচিক্যময় ভাবমূর্তির জন্য পরিচিত প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি এখন ভয়াবহ আর্থিক সংকটে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশ থেকে লাফিয়ে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এই উল্লম্ফনে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র আর আড়ালে রাখা যাচ্ছে না। ফলে প্রিমিয়ার ব্যাংক বর্তমানে এক নজিরবিহীন তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাংকটির আমানত প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দৈনন্দিন দায় পরিশোধে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘অর্ডার ১৯৭২’ এর বিশেষ ক্ষমতাবলে ব্যাংকটিকে ৫ হাজার কোটি টাকার জরুরি তারল্য সহায়তা প্রদান করেছে।

যার ফলে ব্যাংকটি ধারাবাহিক ভাবে লোকসান বাড়ছে। সর্বশেষ ব্যাংকটির তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই ২৫-সেপ্টেম্বর ২৫) শেয়ার প্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ৪ টাকা ৩৯ পয়সা। গত অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ার প্রতি মুনাফা ছিল ৪৪ পয়সা। অপরদিকে, অর্থবছরের তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি ২৫-সেপ্টেম্বর ২৫) কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসান (ইপিএস) হয়েছে ৫ টাকা ৪৯ পয়সা।

গত অর্থবছরের একই সময়ে শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ০৩ পয়সা। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ শেষে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি সম্পদ (এনএভি) হয়েছে ১৬ টাকা ১৫ পয়সা। তবে ২০২৪ সালে ১৩ বছর পর প্রথম ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের নো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। তবে ২০২৫ সালে ব্যাংকটির লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শেয়ারহোল্ডারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে প্রিমিয়ার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪২ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালের একই সময়ে এই হার ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। তার আগের বছর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশেরও নিচে ছিল। খেলাপি ঋণের এই বিস্ফোরণের ফলে ব্যাংকটিকে বিপুল অঙ্কের প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য বলছে, এই ক্ষেত্রেও মারাত্মক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংক।

ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। আর্থিক অবস্থার দ্রুত অবনতির প্রভাব পড়ে আমানতে। ঝুঁকি আঁচ করতে পেরে আমানতকারীরা টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ, পর্ষদ ভেঙে দেওয়া এবং ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের ফলে ব্যাংকটির সংকট আরও ঘনীভূত হয়।

এসব মিলিয়ে গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রিমিয়ার ব্যাংককে গুনতে হয়েছে ৬৭৭ কোটি টাকার নিট লোকসান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে ২৬ বছর দায়িত্ব পালন শেষে ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁর সরে যাওয়ার পরই ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার ব্যাংকের মোট ঋণের বড় একটি অংশ মাত্র ২৪ জন বড় গ্রাহকের কাছে কেন্দ্রীভূত, যাদের অনেকেই বর্তমানে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। শীর্ষ ঋণগ্রহীতাদের তালিকায় রয়েছে বসুন্ধরা, ব্লু প্ল্যানেট, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং, কর্ণফুলী, ক্রনি, ভিনসেন কনসালট্যান্সি, জাজ ভূঁইয়া, আব্দুল মোনেম লিমিটেড, এসিআই, ডায়মন্ড ও ডরিনসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যবসার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়ে। আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ী কার্যক্রম গুটিয়ে নেন, কেউ আইনি জটিলতায় পড়েন, কেউ আবার দেশ ছাড়েন। ফলে ঋণ আদায় কার্যত থমকে যায়। একই সঙ্গে ঋণ শ্রেণিকরণ নীতিমালা কঠোর করায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সাত সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করে। উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার আরিফুর রহমানকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনিই ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম তদারক করছেন।

নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপের মধ্যেই ব্যাংকটির আমানত প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে মোট আমানত ছিল ৩৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, সেখানে গত সেপ্টেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকায়। চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, বর্তমান সংকট মূলত বিগত বছরগুলোর অনিয়ম ও ভুল সিদ্ধান্তের ফল। আমরা ব্যাংককে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তায় কিছু ঋণ পুনঃতফসিল করা হচ্ছে। ফলে ডিসেম্বর প্রান্তিক থেকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এছাড়া অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার বাধ্যবাধকতার কারণেই বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সময় চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তবে সংকটের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, রয়েছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের সময়ে ব্যাংকটিতে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যাংকের সম্পদ ব্যবহার, অস্বাভাবিক চড়া সুদে আমানত রাখা, জব্দ হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন এবং বিজ্ঞাপনের নামে তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে ৪০ মাসের বেশি সময় ধরে ইকবাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বনানীর ইকবাল সেন্টারের ২০ ও ২১ তলার ভাড়া বাবদ ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ১০ কোটি ৩১ লাখ টাকা যে ফ্লোরগুলো ব্যাংক আদৌ ব্যবহারই করেনি।

১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রিমিয়ার ব্যাংক আওয়ামী লীগ নেতা এইচ বি এম ইকবাল ও তাঁর পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গত বছরের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংকটির নেতৃত্বেও বদল আছে। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে পুরোপুরি ইকবাল পরিবারমুক্ত করে। পর্ষদ ভেঙে একজন শেয়ারধারী পরিচালক ও পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালককে দিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ইকবাল ও তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন ইকবাল সেন্টারে অবস্থিত হওয়াকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকিং বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছে। বিএফআইইউর তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সাবেক এমডি এম রিয়াজুল করিমসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা পাচারে সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড অপব্যবহার করে সাবেক চেয়ারম্যান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেশে অর্থ পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন ও প্রচারের নামে ৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর দুই ছেলে এবং ব্যাংকের কর্মকর্তা ও পর্ষদ সদস্যসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। অনিয়মের বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি বর্তমান চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিষয়টি দুদকের তদন্তাধীন। সরকার পরিবর্তনের পর সাবেক চেয়ারম্যান দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে ব্যাংকটিতে ফরেনসিক অডিট চলছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফরকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং ওয়ান ব্যাংকের সাবেক এমডি মনজুর মফিজকে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংক এখন শুধু একটি আর্থিক সংকটে নয় এটি পরিণত হয়েছে আস্থা, শাসন ও টিকে থাকার বড় পরীক্ষায়।