স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ায় অন্তবর্তীকালীন সরকারের কাছে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কার্যকর উদ্যোগ নিলেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। দীর্ঘদিন থেকে এসব শেয়ারের মাধ্যমে বাজারে কারসাজি করে বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। তবে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করছে একটি চক্র।

ফলে মৌলভিত্তির শেয়ার উপেক্ষা করে কখনও কখনও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের দাম হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করে। কিছুদিন বাড়ার পর আবার হঠাৎ করে অস্বাভাবিক দরপতন হচ্ছে। এর ফলে শেয়ারহোল্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর সবই ছোট মূলধনের সর্বস্ব কোম্পানি। এ কারণে এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করেই প্রভাবিত করা যায়। যে কারণে চক্রটি কারসাজি করতে ছোট মূলধনের দুর্বল কোম্পানিগুলো বেছে নিচ্ছে। এসব কারণে দুর্বল কোম্পানির শেয়ার কিনে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তথ্য প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি ইনটেক লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজি চলছে। মুলত দীর্ঘ বছর ধরে ব্যবসায় ভালো করতে পারছে না কোম্পানিটি। সর্বশেষ সমাপ্ত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে চার বছর গুনতে হয়েছে লোকসান। সম্পদের তুলনায় দায়ের পরিমাণও বেশি। কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন নিরীক্ষকও।

এমন দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানিটির শেয়ারদর সাম্প্রতিক সময়ে হু হু করে বাড়তে দেখা গেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ কেন কোম্পানিটির শেয়ারদরে এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন? ফলে গত ফেব্রুয়ারী কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিলো ২৮ টাকা ৭০ পয়সা। মাত্র ১০ কার্যদিবসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দাম ৩৮ টাকায় লেনদেন হলেও দিনশেষে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা লেনদেন হয়েছে। তবে গুজব ছড়িয়ে মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাকে নিয়োগ দেওয়ার দুই দিন আগে থেকেই ইনটেক লিমিটেডের শেয়ারদর বাড়তে থাকে। আর গভর্নর নিয়োগের পরদিন সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ সীমা তথা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায় কোম্পানির শেয়ারদর। গভর্নরের নিয়োগের পূর্বে ও পরে মাত্র চার কার্যদিবসে শেয়ারদর ২৯ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৩৭ টাকা ৪০ পয়সায় উঠে যায়। এই চারদিনে কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ে প্রায় ২৬ শতাংশ।

এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ খুঁজতে বাজার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি বাজারে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এই কোম্পানিটি নবনির্বাচিত গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং এখানে তার বড় অংশের মালিকানা রয়েছে। স্বার্থান্বেষী একটি পক্ষ নিজেরা প্রথমে শেয়ার কিনে পরে বাজারে এই গুজব ছড়িয়ে দিলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

এতে হঠাৎ করেই কয়েকদিনের ব্যবধানে শেয়ারটিতে বিক্রেতার তুলনায় ক্রেতার চাপ বেড়ে যায়। ফলে হু হু করে শেয়ারদরও বেড়ে যায়। বস্তুতপক্ষে ইনটেক লিমিটেডে গভর্নরের নামমাত্র মালিকানা রয়েছে, যার পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। তার হাতে থাকা এই স্বল্প পরিমাণ শেয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির শেয়ার বিক্রি সংক্রান্ত আইনের জটিলতায় বিক্রি করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

বিএসইসির আইনে বলা রয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে শেয়ার ধারণের পরিমাণ ন্যূনতম ৩০ শতাংশ হতে হবে। কোম্পানিটির বিদ্যমান উদ্যোক্তা-পরিচালকরা দীর্ঘ বছর ধরে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে আছে। অন্য উদ্যোক্তা-পরিচালকরা নতুন করে কোম্পানির মালিকানা বাড়াতে উৎসাহী না হওয়ায় গভর্নর দীর্ঘ বছরে তার ধারণকৃত শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানাও বিক্রি করতে পারেননি।

এদিকে বাজারে আরেকটি গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, ইনটেক লিমিটেডের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ এবং এই শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে গভর্নরের ব্যবসায়িক সু-সম্পর্ক থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ সুবিধা পেতে পারে।

এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানিটির শেয়ার অতি লোভনীয় করে তোলা হয়। বস্তুতপক্ষে, গভর্নর এই কোম্পানির মালিকানার বড় অংশ অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন এবং বিতর্কিত শিল্প গোষ্ঠিও শেয়ারবাজারের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের থেকে শেয়ার কিনে মালিকানায় এসেছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ইনটেক লিমিটেডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠার সময়ে এর মালিকানায় এস আলম গ্রুপ ছিল না। এস আলমের সহযোগীরা পরবর্তী সময়ে শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। ২০০২ সালে ইনটেক যখন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তখন বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ছিলেন কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও চেয়ারম্যান। সে সময় তার কাছে কোম্পানির মোট শেয়ারের ৬৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ ছিল। বর্তমানে তার শেয়ারের পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ। কোম্পানিটিতে গভর্নরের কোনো ভূমিকা নেই এবং দীর্ঘ বছর ধরে তিনি পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন না।

এ বিষয়ে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, গভর্নরের ওই প্রতিষ্ঠানে শেয়ার আছে কিনা, সেটিও তার স্মরণ নেই। দীর্ঘ বছর তিনি ওই কোম্পানির সঙ্গে কোনো যোগাযোগও করেননি। একটি গোষ্ঠী ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন। তিনি গভর্নর হওয়ায় ওই পক্ষটি বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে তার যোগসূত্র খোঁজার অপচেষ্টা শুরু করেছে। বস্তুত গভর্নরকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক।

২০০২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় কোম্পানিটি বছরে কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা করলেও, এখন কোটি টাকার ব্যবসা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানির মাত্র ২৩ লাখ টাকা পরিচালন আয় হয়েছে। বিভিন্ন ব্যয় বহন করে ওইবছর ৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা নিট লোকসান হয়েছিল। পরের বছর ৫৮ লাখ টাকা আয় করে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা লোকসান করেছে। পরের বছর ১ কোটি টাকার সামান্য বেশি আয় করলেও ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হয়। তার পরের বছর অবশ্য ৫০ লাখ টাকা মুনাফা করেছিল। আর সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা নিট লোকসান হয়েছে।

ধারাবাহিক লোকসানের ফলে ৩১ কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। কোম্পানির শেয়ার মূলধন থেকে এই পুঞ্জীভূত লোকসান বাদ দেওয়া হলে বর্তমানে ইনটেক লিমিটেডের সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণাত্মক রয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটির কোনো কারণে অবসায়নে গেলে বিনিয়োগকারীরা কিছুই পাবেন না।

উল্টো কোম্পানির ঘাড়ে বাড়তি দায় থাকবে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলতে পারবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক মাহমুদ সবুজ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। এত দুর্বল আর্থিক ভিত্তির এই কোম্পানির শেয়ারদর বাড়াতে গভর্নরের নাম ব্যবহার করে শেয়ারের দাম বাড়িয়েছে একটি কুচক্রী মহল।