যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি-রেমিটেন্স-খাদ্যপণ্যের বাজার নিয়ে শঙ্কা
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে চলমান যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্তে না এলেও, এর ছাপ যে এখানেও পড়ছে সেটি স্পষ্ট। কারণ বিশ্ববাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পঞ্চম দিনেই যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ওই অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম হাব হওয়ায় এই যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে গোটা বিশ্বে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবাদেরা।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন গোলাবারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে, তখন তার আঁচ সুদূর বঙ্গোপসাগরের কূলের এই বদ্বীপের সাধারণ মানুষের রসুইঘরেও এসে লাগে। তা সে বিশ্বমানচিত্রে দামেস্ক, তেহরান কিংবা হাইফা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে নিরাপদ দূরত্বে বসে থাকুক না কেন। কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশের অর্থনীতিও অন্যান্য দেশের অর্থনীতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।
সারাবিশ্বের ভূরাজনৈতিক অর্থনীতির চেইন রিঅ্যাকশন থেকে দূরে থাকার কোনো সুযোগ নেই তার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ খামেনিসহ দেশটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা এই হামলায় নিহত হয়েছেন। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। ওই অঞ্চল বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান হাব। যে কারণে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে গোটা বিশ্বে।
দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের খবর ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশে জ্বালানি ও রপ্তানি খাতে সরাসরি আঘাত হেনেছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব দেখা যাবে বলেও আশঙ্কা করছেন দেশের অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্তে আঘাত না করলেও অর্থনীতিতে এর প্রভাব মারাত্নক।
ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে গত বৃহষ্পতিবার রাত থেকে তেলের সরবরাহ কমে আসতে দেখা গেছে। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে যানবাহনগুলোকে। তাছাড়া তেল সমৃদ্ধ ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববাজারেরও দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে। আবার বাংলাদেশের মতো দেশে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে বাস-ট্রাকের ভাড়া যেমন বাড়তে পারে, তেমনি বৃদ্ধি পেতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং সারের দামও।
ফলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কা থাকে, যার প্রভাব পড়তে পারে চাল, ডাল ও সবজির বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে পারে আমদানি করা ভোজ্যতেল, গম কিংবা চিনির দাম। যার ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিংবা সৌখিন পণ্যে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌছাতে আর খুব বেশি দেরি নেই। অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, মূলত আমদানি নির্ভর দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এ কারণেই বিকল্প উৎস এবং আর্থিক সংস্থানের বিষয়ে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলছেন, আমাদের জ্বালানি মজুদের যে তথ্য পাচ্ছি, সেই অনুযায়ী, ডিজেল আছে দুই সপ্তাহ, কেরসিন ছাড়া আর সবগুলোই তো দুই সপ্তাহ থেকে ছয় সপ্তাহের বেশি নাই। আমাদের অবশ্যই বিকল্প কোনো জায়গা থেকে কেনা যায় সেটি ঠিক করতে হবে। এছাড়া পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব রপ্তানিকারক এরই মধ্যে সমস্যায় পড়েছেন, তাদের পাশেও সরকারের দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন সেলিম রহমান।
এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্যে বলা হচ্ছে, ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে আরব আমিরাতের মজুদ রাখা জ্বালানি ট্যাঙ্কারে। নিজেদের বেশ কয়েকটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি স্থাপনায় ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর জানিয়েছে কাতার। হামলা হয়েছে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারেও।
সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহনে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড। তারা সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালী কেউ পার করার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জ্বালানি মূল্যে।
তেলের দামের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড বৃহস্পতিবার ব্যারেল প্রতি ৮৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হামলার প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তুলনা করলে ওই দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য শিগগিরই ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এমন প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য ভয়াবহ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে।
জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই আসে। যার বড় যোগানদাতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার এবং ওমান। এই দেশগুলো থেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি কেনা হয়। কিন্তু ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ইতোমধ্যে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ, যার বেশিরভাগই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জ্বালানিও আসে এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই। অর্থাৎ জ্বালানির কারণে বিদ্যুৎ সংকট এবং সেখান থেকে কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, সব মিলিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক এম এস সিদ্দিকী বলেন, সারা প্রথিবীর বড় বড় প্রেট্রোকেমিক্যাল সাপ্লাইয়াররা তাদের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ তারা অবজার্ভ করছে। যদি তারা অর্ডার নিয়ে ভবিষ্যতে পণ্য সরবরাহ করতে না পারে, এই ভয়ে তারা অর্ডার নিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, প্রেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের মূল কাঁচামাল আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সেখান থেকেই যদি কাঁচামাল না আসে তাহলে সারা বিশ্বের সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের বিশৃংখলা দেখা দেবে।
অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, তেলের দাম বাড়লে সরকারকে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে অনেক বেশি ডলার খরচ করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়বে, যা মুদ্রার বিনিময় হার বা ডলারের দাম অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করে সরকারকে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সংকোচনের মতো পদক্ষেপ এখনই বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সব থেকে বড় শঙ্কা তৈরি করায় এরই মধ্যে ‘জ্বালানি সাশ্রয়’ নীতি গ্রহণের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিয়ে সতর্কও করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। আপাতত সাশ্রয়ের পাশাপাশি অন্য কোনো দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা যায় কিনা -এ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, জ্বালানি সাশ্রয় করে চললে ঈদের ছুটি পর্যন্ত বা মার্চ মাস পর্যন্ত মজুত জ্বালানি দিয়ে চলা যাবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বাজারে যায়। বিশেষ করে পোশাক খাতের ওপর ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়ছেন এই খাতের ব্যবসায়িরা।
তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর কিংবা সুয়েজ খালের মতো রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হলে জাহাজ কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তারা বলছেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ইতোমধ্যে অর্ডার সংকুচিত করেছে অনেক দেশ। এছাড়া জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। রুট পরিবর্তন করায় রপ্তানির লিড টাইম বেড়ে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলছেন, জ্বালানির সঙ্গে সব কিছুই জড়িত। এর দাম বৃদ্ধি পেলে কেবল বাংলাদেশ নয় প্রভাবিত হবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি।
অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বল্প এবং দীর্ঘ মেয়াদি দুই ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। আমাদের রপ্তানি পণ্য বন্দরে বসে আছে, অন্য রুট ধরে যেসব পণ্য যাচ্ছে সেগুলোর পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, ইনসুরেন্স কস্ট বেড়েছে, ক্রুড অয়েলের দাম বেড়ে গেছে। কেবল পোশাক রপ্তানি নয়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে পারে অন্যতম কৃষি উপকরণ সারের ওপরও। কারণ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে কাতার ও সৌদি আরব থেকে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা চলমান থাকলে সারের সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সময়মতো সার আমদানি করতে না পারলে দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এছাড়া দেশিয় কারখানায় সার উৎপাদনের জন্যও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনও প্রভাবিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি কিছু মজুত থাকলেও নতুন আমদানি ব্যাহত হলে তা দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। যার বড় প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি উৎপাদনে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসী আয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে প্রায় এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত, যার সিংহভাগই রয়েছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, দেশের বাইরে বসবাস করা বাংলাদেশি অভিবাসীর অন্তত ৬০ লাখেরই গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এরই মধ্যে নানা সংকট তৈরি হয়েছে এই প্রবাসীদের। ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত অন্তত দুইশ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে ইচ্ছুক অনেক বাংলাদেশি নিজ দেশেই থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
]এছাড়া যুদ্ধাবস্থা চলমান থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই অন্য দেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করতে পারে। এতে করে নতুন কর্মী নিয়োগ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়াসহ নানা জটিলতায় পরবর্তীতে আর দেশগুলোতে যাওয়া হবে কিনা এমন শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
অতীতে কুয়েত যুদ্ধের সময় হাজার হাজার বাংলাদেশিকে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে হয়েছিল। করোনার সময়ও দেখা দিয়েছিল এমন সংকট। এমন পরিস্থিতি পুনরায় তৈরি হলে তা দেশের বেকারত্ব সমস্যার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। যদিও রেমিটেন্স প্রবাহের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে তেমন প্রভাব পড়বে না বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসে কাজ হারানোর শঙ্কা রয়েছে, শ্রমবাজারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি নিয়েও শঙ্কা আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে রেমিট্যান্স প্রভাবিত হবে, এখনই বড় ধরণের প্রভাব দেখছি না। আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তাটাই এখন বড় চিন্তার বিষয়।
পরিসংখ্যাণ ঘেটে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন যে পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, তার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পার হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। বাংলাদেশের ব্যবহৃত মোট তরল জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশ এবং গ্যাস চাহিদার একটি বড় অংশই মেটানো হয় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আমদানির মাধ্যমে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার সিংহভাগ আসে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এর পাশাপাশি আমাদের বিদ্যুৎ খাতের লাইফলাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি, যা প্রধানত কাতার ও ওমান থেকে আসে।
ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। লোহিত সাগরে মালবাহী জাহাজের বিমা খরচ বাড়তে শুরু করেছে। লোহিত সাগরে অস্থিরতার কারণে জাহাজ ভাড়া এবং বিমা প্রিমিয়াম ইতিমধ্যে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের আমদানি ব্যয়ের ওপর। এর মধ্যে বাংলাদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা এখনও কেবল নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কিছুটা সস্তির বার্তা দিচ্ছিল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সেই সস্তিকে কিছুট ফিকে করে দিল।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম যখন ৩০ থেকে ৩৫ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তখন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যে টান পড়েছিল, তার ক্ষত আজও শুকায়নি। এই ডলার সংকট বা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির সম্পর্কটি অত্যন্ত নিবিড়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, আমাদের নেট রিজার্ভ (বিপিএম ৬ পদ্ধতিতে) ৩০ বিলিয়ন ডলার। যা দিয়ে খুব বেশি মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। এর ওপর যদি বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তবে প্রতি মাসে অতিরিক্ত কয়েকশ মিলিয়ন ডলার গুনতে হবে।
২০২৪ সালের প্রথমার্ধের পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের মোট আমদানির প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে শুধু জ্বালানির ব্যয় মেটাতে। এই টাকাটা যখন আমরা বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তখন দেশের ভেতরে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়লে কেবল পরিবহণ খরচ বাড়ে না বরং সেচের পাম্প থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ পর্যন্ত সবকিছুর ওপর এক প্রকার ডোমিনো ইফেক্ট তৈরি হয়।
তাছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলো অর্থের জোগান বা যন্ত্রাংশের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, মোট রপ্তানির ৮৫ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে এই খাত। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাতটি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা সরাসরি আমাদের রপ্তানি আয়ে আঘাত হানছে। এটি একটি ভয়ানক চক্র—জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, রপ্তানি কমে, ডলারের আয় কমে আর তার ফলে আবারও জ্বালানি আমদানির ক্ষমতা হ্রাস পায়।
বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হারুন-উর-রশিদ বলেন, বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় সবসময় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার শিকার হয়। ইতোমধ্যে হুতি হামলার কারণে লোহিত সাগর দিয়ে পণ্য পরিবহন কমিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, যদি রাশিয়া ও চীন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ইতোমোধ্য মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া এতদিন ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির জন্য লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজখাল হয়ে যে সমুদ্রপথ (রুট) ব্যবহার হতো, তা এখন আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর পরিবর্তে ভারত মহাসাগর হয়ে ভূমধ্য সাগর ব্যবহার করা পণ্য পৌছাতে বাড়তি ৭ দিন সময় লাগবে। এতে আমাদের জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাবে। হুতি হামলার ভয় রয়েছে। ফলে পণ্য রপ্তানির আয় কমে যাবে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালালি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের বাজারে উৎপাদন খরচ বাড়বে, কারণ বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। এর জন্য বিকল্প জ্বালানীর উৎস খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন তিনি। এর আগে বাংলাদেশি পোশাক ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, কিন্তু সেই যুদ্ধ এখন চার বছর ধরে চলমান। তিনি বলেন, তাই যদি যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে কুয়েত, ইরাক, ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রপ্তানি বাজারগুলো মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ইরানের প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজারে প্রায় ১০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। যার বেশিরভাগত পোশাক ও ওষুধ পণ্য।



