মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে ৫ কার্যদিবসে ডিএসইতে ৬৬৩ পয়েন্ট সূচক উধাও
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় দরপতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। ফলে টানা দরপতনে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে বিনিয়োগকারীদের মাঝে। মুলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঘিরে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় পুঁজিবাজারে সূচকের বড় ধরনের ধস নেমেছে। ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৩১ পয়েন্ট কমে গেছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ পতন।
যা দিনশেষে ডিএসইএক্স সূচক ২৩১ পয়েন্ট বা প্রায় ৪.৪২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮ পয়েন্টে। সর্বশেষ ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কজনিত বিক্রির কারণে এ ধরনের বড় পতন দেখা গিয়েছিল। মুলত বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধাবস্থার অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও।
ফলে গত সপ্তাহে চার কার্যদিবসে ও সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস মিলে পাঁচ কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের পতনে ৬৬৩ পয়েন্ট সূচকের পতন হয়েছে। মুলত এ পতনের পিছনে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা শুধু তাই নয় পুঁজিবাজারকে অস্থির করে তুলতে কারসাজি চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে চক্রটি পুঁজিবাজারের সূচকে প্রভাব ফেলতে পারে (ইনডেক্স মুভার স্ক্রিপ্ট), এমন কোম্পানির শেয়ার চিহ্নিত করে তা কম দামে বিক্রির চেষ্টা করছে।
মূলত কম দামে ইনডেক্স মুভার শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে সরকারকে বিব্রত করতে কারসাজি চক্র এ অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে জোর গুঞ্জন চলছে। তবে পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে এখনই বিএসইসি চেয়ারম্যানের পরিবর্তনের বিকল্প নেই। কারণ বিএসইসি চেয়ারম্যানের পরিবর্তন কেন্দ্র করে বাজার অস্থির হয়ে উঠছে। তেমনি বিএসইসি চেয়ারম্যান পরিবর্তন হলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনে করছেন একাধিক বিনিয়োগকারীরা।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইতে ১৩৮ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে। এই দরপতনের পর সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পরিবর্তনের খবরে ৭২ পয়েন্ট সূচক বাড়ে। এরপর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে ডিএসইতে সূচকের ২০৮ পয়েন্ট দরপতন হয়। ফলে সপ্তাহের চতুর্থ কার্যদিবসে বড় ধরনের দরপতন না হলেও দিনশেষে সূচকটি কমে ২ পয়েন্ট।
সর্বশেষ সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস ব্যাংক ও আর্থিক খাতের মুনাফা তোলার চাপে ৮২ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে। এছাড়া সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে শেয়ার বিক্রির চাপে ২৩১ পয়েন্ট রেকর্ড পরিমান দরপতন হয়েছে।
যার ফলে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধাবস্থার অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রমজান মাসে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়ায় বাজারে চাপ আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে খুব একটা ইতিবাচক পরিবেশ দেখা যায়নি।
প্রথমত তিন ইস্যুতে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়তে পাওে এই শঙ্কা থেকে আতঙ্কগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দেন।
দ্বিতীয়ত, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পদে পরিবর্তন নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনেক দিন ধরে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে। গত শনিবারের পর বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেটি হয়নি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া খবরটি ‘গুজব’ ছিল।
ফলে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ নিয়ে একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সেটি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ দরপতন ঘটিয়ে চেয়ারম্যানকে সরাতে সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন বলে মনে করছেন অনেকে। এ কারণে বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।
তৃতীয়ত, পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর ঘনিয়ে আসায় অনেক বিনিয়োগকারী প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে শেয়ার বিক্রি করছেন। ফলে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ আরও বেড়ে গেছে।



