আস্থা ফেরাতে স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের দাবী বিনিয়োগকারীদের
শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ব্যাপক দরপতনের পর দ্বিতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় উত্থানে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে সূচকের উত্থান হলেও বাজার নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না। কারণ এর আগেও টানা দরপতনের পর মাঝে মধ্যে সূচকের উকি মারলেও ত স্থায়ী হচ্ছে না। ফলে একটি স্থিতিশীল পুঁজিবাজারের দাবী জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পরও সেই পুরোনো চেহারা বিরাজ করছে পুঁজিবাজারে। মাঝে মধ্যে সূচক বাড়লেও ফের দরপতন আর তীব্র তারল্য সংকটের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানান, পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই আস্থার সংকট বিরাজ করছে। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাজারে নতুন করে গতি পাবে এমন প্রত্যাশা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এ কারণে বাজারে গত পাঁচ কার্যদিবসে ৬৬৩ পয়েন্ট সূচকের দরপতন হয়েছে।
এ বিষয় জানতে চাইলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)
সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এ কারণে বাজারে ‘প্যানিক সেল’ হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের আচরণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ যুদ্ধের কিছু প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক নয়। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে প্রভাব পড়েছে, এটি স্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মতপ্রকাশ করেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহের স্থবিরতা ভেঙে হঠাৎ করেই প্রত্যাশার বাইরে ইতিবাচক আচরণ দেখাল পুঁজিবাজার। তবে টানা দরপতনের পর সূচকের বড় উত্থান হলেও আতঙ্ক কাটেনি বিনিয়োগকারীদের। এদিন সূচকের সাথে বেড়েছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। এছাড়া অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সিংহভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি মূল্য সূচকের বড় উত্থান হয়েছে। তবে ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে। মুলত ব্যাংক ও আর্থিক খাতের শেয়ারে জোরালো আগ্রহের ফলে বাজারে এ অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়। ডিএসই ও সিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর গত সপ্তাহে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে চার কার্যদিবসেই দরপতন হয়। এতে এক সপ্তাহেই ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৫৯ পয়েন্ট। আর বাজার মূলধন কমেছে ২০ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেও সূচকের বড় দরপতনে একদিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ২৩১ পয়েন্ট কমে যায়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখানে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। কখনো গুজব, কখনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আবার কখনো কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই বাজারে বিক্রয়চাপ বা ক্রয়চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে দীর্ঘ মন্দার পর এই উত্থান বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া ব্যাংক-বিমা ও আর্থিক খাতের পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আসন্ন আর্থিক প্রতিবেদন ও লভ্যাংশ ঘোষণার প্রভাব সামনে বাজারে আরো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরবে বলেই মনে করছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিতে পারে, তার প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে এমন গুজবে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। সামনের দিনগুলোতে বাজার আরও খারাপ হবে, সেই আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ায় বিক্রির চাপে গত রোববার বড় পতন হয়েছিল বলে মনে করেন তিনি। তবে গুজবের অবসান ঘটে সরকারের নীতি নির্ধারকরা জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিবে না এমন বক্তব্যে কিছুটা হলেও আতঙ্ক কাটছে বিনিয়োগকারীদের।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১৩২ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ১৪১ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২১ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৩৫ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৫৫ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৭৫ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯০ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৫১ টির, দর কমেছে ১৭ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ২০ টির। ডিএসইতে ৪১৬ কোটি ৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৫৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৮২ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৮৭ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৩৮ টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৩ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৬২ টির এবং ১৩ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ৪৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



