ন্যাশনাল ফিডের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারসহ অনিয়মের ফিরিস্তি
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিবিধ খাতের কোম্পানি ন্যাশনাল ফিড মিলস লিমিটেডের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাপক অনিয়ম ও অসংগতির চিত্র ফুটে উঠেছে। এছাড়া কোম্পানিটি ১১ বছরের মধ্যে গত ৯ বছর ধরে ব্যবসায় ধুকছে। আর এই কোম্পানিটি থেকেই উদ্যোক্তা/পরিচালকদের ব্যক্তিগত কোম্পানিতে অবৈধভাবে টাকা সড়ানো হয়েছে।
এতে প্রতারিত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানটির কেনাকাটা ও মুনাফা এবং ঋণের সুদসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের গরমিল খুঁজে পেয়েছেন। কোম্পানিটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আর্থিক হিসাবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ন্যাশনাল ফিড মিলস তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার কাঁচামাল ক্রয়ের কথা বললেও ভ্যাট রিটার্নে তা ১০ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার ক্রয় হিসাব কম দেখিয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নিট মুনাফা ও শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) প্রকৃত অঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি প্রদর্শিত হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল অংকের কেনাকাটার বিপরীতে কোনো লেজার, ভাউচার বা প্রমাণপত্র নিরীক্ষককে দেখাতে পারেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানিটি ব্যাংক এশিয়া থেকে নেওয়া ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার ঋণের কোনো স্টেটমেন্ট বা বিবরণী নিরীক্ষককে সরবরাহ করেনি। আর্থিক বিবরণীতে সুদের খরচ ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কম দেখিয়ে মুনাফাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। এছাড়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ বা ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সমন্বয়ের বিষয়েও কোনো উপযুক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কোম্পানিটির শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা জমা থাকলেও তা কয়েক বছর ধরে শ্রমিকদের পরিশোধ করা হচ্ছে না।
এছাড়া তিন বছরের বেশি সময় ধরে অবণ্টিত বা আনক্লেমড ডিভিডেন্ড বাবদ ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। উল্টো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকার ঘাটতি পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে কোম্পানির গুদামে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকার পণ্য বা ইনভেন্টরি থাকার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী ইনভেন্টরি ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট বা মালামাল গণনার কোনো শিট নিরীক্ষককে দেওয়া হয়নি। এমনকি কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের অসযোগিতার কারণে মালামালের বাস্তব উপস্থিতিও যাচাই করতে পারেনি নিরীক্ষক দল।
এছাড়া ব্যাংক ঋণের হিসাব নিয়েও চরম লুকোচুরি খেলেছে এই কোম্পানি। ব্যাংক এশিয়া থেকে নেওয়া ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার ঋণের কোনো বিবরণী তো দেওয়া হয়নিই, উল্টো সুদের খরচে ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা কম দেখিয়ে মুনাফাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধের কোনো প্রমাণ দিতে না পারা প্রমাণ করে যে, কোম্পানিটি কার্যত দেউলিয়া বা চরম অদক্ষতার চোরাবালিতে নিমজ্জিত।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক হিসাবের নোট ৮.০০ এ অ্যাডভান্স, ডিপোজিট ও প্রিপেমেন্টস খাতে মোট ৪ কোটি ১ লাখ টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়িক কোনো স্বার্থ ছাড়াই উদ্যোক্তা–পরিচালকদের ব্যক্তিগত কোম্পানি ন্যাশনাল হ্যাচারিকে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং কর্ণপুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কাঁচামাল কেনার জন্য এক সরবরাহকারীকে ৫২ লাখ টাকা এবং অন্যান্য সরবরাহকারীকে ১৩ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার তথ্য আর্থিক হিসাবে দেখানো হয়েছে। তবে নিরীক্ষক এ বিষয়ে কোনো লেজার, সরবরাহকারীর তালিকা বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি পাননি। ফলে উদ্যোক্তা–পরিচালকেরা অর্থ আত্মসাত করে ভুয়া অগ্রিম প্রদানের তথ্য আর্থিক হিসাবে দেখিয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
অন্যদিকে কোম্পানিটি যাচাই বাছাই ছাড়া বাকিতে পণ্য বিক্রি করেছে, যার বড় অংশ এখনো আদায় হয়নি। এর ফলে গ্রাহকদের কাছে কোম্পানিটির পাওনা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। কিন্তু হিসাবমান অনুযায়ী এই পাওনার মধ্যে আদায়–অযোগ্য অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে বাদ দেওয়া হয়নি এবং এ বিষয়ে কোনো সঞ্চিতিও গঠন করা হয়নি।
ফলে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ি, মুনাফার ৫ শতাংশ দিয়ে ওয়ার্কার্স প্রফিট অ্যান্ড পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) গঠন এবং শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ করতে হয়। এই আইনের আওতায় কোম্পানিটিতে ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার ফান্ড গঠন করা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ি কয়েক বছর ধরে প্রদান করছে না।
ডিএসইর সূত্র মতে, ন্যাশনাল ফিড মিল ২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ১৮ কোটি টাকা সংগ্রহের পরে প্রথম ২ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি মুনাফা ১ টাকার উপরে থাকলেও এরপর থেকে টানা পতন শুরু হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ০.৫৬ পয়সা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ০.১৫ পয়সা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ০.১৭ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে ০.১৮ পয়সা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ০.০৮ পয়সা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ০.০২ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ০.৭১ পয়সা লোকসানে ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ০.০৩ পয়সা ইপিএস হয়েছে।
২০১৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ২০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৯৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ১০ হাজার টাকা। রিজার্ভে রয়েছে ১০ কোটি ২২ লাখ টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬১ হাজার ৩২৪টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩০ দশমিক ৪০ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১২ দশমিক ৩০ শতাংশ ও বিদেশী বিনিয়োগকারী ০ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।



