আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাজারে হু-হু করে বাড়ছে সোনালি মুরগির দাম। গত এক মাসের ব্যবধানে এই জাতের মুরগির দাম কেজিতে বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৪০ টাকা। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গরুর মাংস কেনার সাধ্য কম এমন নিম্ন ও মধ্য শ্রেণির ক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় বার্ড ফ্লুর প্রকোপ বেড়েছে। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সোনালি মুরগি।

যার প্রভাব পড়েছে বাজারে। তারা জানান, পাইকারি বাজারে মুরগির সরবরাহ কমে গেছে। এ ছাড়া পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশি দামে কিনে এনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ার কারণে অনেক দোকানে মুরগি বিক্রি আগের চেয়ে প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

ফলে খুচরা পর্যায়ে এক কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪২০ থেকে ৪৩০ টাকা দরে। গত এক মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে অন্তত ১৪০ টাকা বেড়েছে। সাধারণত ঈদের পরে বাজারে মুরগির দাম কম থাকে। কিন্তু এ বছর ভিন্ন চিত্র। তবে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। মুরগির খামারি, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা জানান, মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের দাম বাড়ায় অনেক খামারি মুরগি পালন কমিয়ে দিয়েছেন।

এ ছাড়া গত দুই–তিন মাসে রোগের আক্রমণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মুরগি মারা যায়। এ কারণে খামারে সোনালি মুরগির উৎপাদন কমেছে। ফলে সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সোনালি মুরগির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া চলমান জ্বালানিসংকটও মুরগির মূল্যবৃদ্ধিতে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তাঁরা।

ঈদের পরে গতকাল বুধবার প্রথম কাঁচাবাজারে এসেছেন মনিরা ইসলাম। এর মধ্যে বাজারে সোনালি মুরগির দাম যে আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে, সেটা তিনি জানতেন না। এখন দাম শুনে তিনি রীতিমতো আঁতকে উঠেছেন। তিনি বলেন, এত দামে আমি কোনোদিন মুরগি কিনিনি। ঢাকার সেগুনবাগিচা বাজারে মুরগি কেনার সময় দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, উনি (মুরগি বিক্রেতা) প্রথমে আমাকে সোনালি মুরগির দাম ৪২০ টাকা (প্রতি কেজি) বলেছেন, কিন্তু আমি শুনেছিলাম ৩২০ টাকা। পরে শুনছি, না ৪২০ টাকা! আমি একদম আশ্চর্য, রোজার শেষেও এসব মুরগি ৩০০ টাকা ছিল।

মনিরা ইসলাম বলেন, ঈদের পরে গ্রাম থেকে ফিরেছি দুদিন আগে। এর মধ্যে এ কি অবস্থা! এত দামে আমি কখনো মুরগি কিনিনি। কথার মধ্যে দোকানি জহুরুল হোসেন এগিয়ে এলেন। এরপর মনিরা ইসলামের উদ্দেশ্যে বললেন, ম্যাডাম, আপনি বাজারে না এলে জানবেন কীভাবে? গত ঈদের সময় থেকে সোনালি মুরগির দাম ৪০০ টাকার ওপরে। আমরাও এখন ঠিকমতো মুরগি পাচ্ছি না, দামের চোটে বিক্রিও হচ্ছে না আগের মতো।

ঢাকার বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম খুব বেশি না বাড়লেও ঈদের পর থেকে রেকর্ড দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি ও দেশি মুরগি। প্রতি কেজি ব্রয়লার ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৪২০ থেকে ৪৪০ ও দেশি মুরগি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বেড়েছে। বাজারের তথ্য বলছে, অন্য স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক থাকলেও প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম ১৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি মুরগি ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা ছিল।

এছাড়া দেশি মুরগির দাম আগে ছিল ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, যা ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি প্রতি কেজিতে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা এনামুল বলেন, দাম বাড়ার কারণে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারপরও সরবরাহ কম। মূলত মুরগির বিভিন্ন রোগ ও এর সঙ্গে গাড়িভাড়া বেড়ে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।

আরেক দোকানি রিয়াদ বলেন, পর্যাপ্ত সোনালি মুরগি বাজারে আসছে না, আবার আগের মতো গাড়িও আসছে না। কিন্তু একই সময় ব্রয়লার মুরগির দাম ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগে কখনো সোনালি মুরগির দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকা ছাড়ায়নি। ফলে বর্তমান দামকে রেকর্ড বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন তারা। তাদের মতে, খামার থেকে হঠাৎ সরবরাহ কমে যাওয়াই এ দাম বাড়ার মূল কারণ।

বাংলাদেশ ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ ফাহাদ হাবিব বলেন, জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বেড়েছে। এর চেয়ে বড় কথা একই সময়ে বার্ড ফ্লুর মতো রোগ বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যুহারও বেশি। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়ে দাম বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) বলছে, পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লুসহ নানা রোগের আক্রমণ বেড়েছে। পরিবেশের তাপমাত্রা দ্রুত ওঠা-নামার কারণে খামারগুলোতে মুরগির মৃত্যুহার বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগির খামারে এর প্রভাব এখনো সীমিত পরিসরে থাকলেও সোনালি বা কালার বার্ড হিসেবে পরিচিত মুরগির উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে গেছে।

খামারি ও এসব সংগঠন জানায়, গত এক মাসে পোলট্রি খাতে বার্ড ফ্লুর আক্রমণ বেড়েছে। পাশাপাশি হুট করে গরম আসায় নানা রোগের কারণে হঠাৎ করেই খামারগুলোতে ব্যাপক হারে মুরগি মারা যাচ্ছে। কোনো কোনো খামারে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মুরগি মারা যাচ্ছে বলে দাবি তাদের। মুরগির বাজারে ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয় ব্রয়লার মুরগি দিয়ে এবং বাকি ৩০ শতাংশ সরবরাহ আসে কালার বার্ড অর্থাৎ সোনালি ও লেয়ার জাতের মুরগি থেকে।

বিপিআইএ’র সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, গত এক মাস ধরে হঠাৎ করেই খামারগুলোতে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ বেড়েছে। ব্যাপক হারে মুরগি মারা যাচ্ছে এই সংক্রমণে। এমন একটা অবস্থা তৈরি হয়েছে আমাদের পর্যাপ্ত মেডিসিন বা ভ্যাকসিন থাকার পরও এটা ঠেকানো যাচ্ছে না। ব্রয়লারে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। তবে সোনালি মুরগির খামারগুলোতে কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, কোথাও কোথাও আরও বেশি মুরগি মরছে। এ কারণে বাজারে ব্যাপক সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে।

সোনালি মুরগি বেশি উৎপাদন হয় উত্তরাঞ্চলের জয়পুরহাট জেলায়। সেখানকার জামালগঞ্জের খামারি ফুয়াদ হোসেন বলেন, বড় মুরগির বার্ড ফ্লু, আর ছোটগুলোর নানা সংক্রমণে বিক্রি উপযোগী হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে। ১৮-২০ দিন বয়সে মুরগিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শ্বাসতন্ত্রের উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসা দেওয়ার পরও অনেকগুলো সুস্থ হচ্ছে না। খামারে মুরগি ও বাচ্চার মৃত্যুহার কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, খামারগুলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পরও এভাবে মুরগি মারা যাচ্ছে। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল হচ্ছে। আমরা কিছুই করতে পারছি না।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবু সুফিয়ান বলেন, মৌসুমি নানা ফ্লু, গামবুরাসহ কিছু রোগের প্রকোপ দেখা গেলেও এখনো আমরা অফিসিয়ালি বার্ড ফ্লুর সংক্রমণ পাইনি। তবে একটা সংকট তৈরি হয়েছে খামারি পর্যায়ে কিছু মুরগি মারা যাচ্ছে। এর বড় একটি কারণ আসলে দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তন, আবহাওয়ার পরিবর্তন। হঠাৎ হঠাৎ এই তাপমাত্রার পরিবর্তনে নানা রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। এই সংক্রমণগুলোতে মূলত ছোট ছোট খামারিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ, তাদের বায়ো-সিকিউরিটি অনেকটা দুর্বল।

সেটা জোরদারে কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া আমরা এই মুহূর্তে ভ্যাকসিন দেওয়ার ক্ষেত্রে জোর দিচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পরিবহন ভাড়ার কারণে যেমন প্রাণী খাদ্যে খরচ বাড়ছে, তেমনি ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি মুরগি বাজারে সরবরাহে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে খামারিসহ সরবরাহকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গত দুই সপ্তাহে পরিবহন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় যানবাহনের সংখ্যা কমেছে। খামারে উৎপাদন কম থাকায় সংগ্রহকারীদের কম মুরগি সংগ্রহ করতে বেশি বেশি দূরত্বে যেতে হচ্ছে। যে কারণে প্রতি ইউনিটে খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।