মেহেদী হাসান,  দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএটিবিসি) ‘মালিকানা জালিয়াতির মাধ্যমে ৩০ বিলিয়ন ডলার’ পাচারের একটি অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমে কোম্পানিটির বিভিন্ন নথি তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব নথি ও তথ্য চেয়ে বহুজাতিক কোম্পানিটি এবং যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজিআরসি) গত বৃহস্পতিবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মুলত স্বাধীনতার পর পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি কারখানা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা ছিল। তবে ‘জাল নথি’ ও প্রভাব খাটিয়ে সেগুলোর মালিকানা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) হাতে বহাল রাখার অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিএটি বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিবৃতির মাধ্যমে তাদের বক্তব্য জানাবে। গত শনিবার দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

দুদকে আসা অভিযোগে বলা হয়েছে, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি ১৯৪৭ সালে করাচিতে প্রথম কারখানা স্থাপন করে। পরে ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় কারখানা গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই দুই কারখানা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল। এমনকি ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের দুটি কারখানা হারানোর তথ্যও উল্লেখ করে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানিটি পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কর ছাড় ও ক্ষতিপূরণও নেয়। পরে জাল কাগজপত্র তৈরি এবং প্রভাব খাটিয়ে কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়। এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুই কারখানাসহ কোম্পানির মালিকানা ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ৫৫ বছরে বিএটি বাংলাদেশ থেকে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে বিদেশে নিয়ে গেছে। অথচ আইন অনুযায়ী কারখানাগুলো সরকারের মালিকানাধীন হওয়ার কথা ছিল।

অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত সব নথি তলব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন, মালিকানা কাঠামো,

নিবন্ধিত অফিসের তথ্য, কারখানার তালিকা, ইনকরপোরেশন সনদ, অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন, শেয়ারের সংখ্যা এবং পরিচালনা পর্ষদসংক্রান্ত নথিপত্র। যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে এসব নথির সত্যায়িত অনুলিপি আগামী ১৫ জুনের মধ্যে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাবেক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির এক তৎকালীন ফাইন্যান্স ম্যানেজার কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় জাল কাগজপত্র প্রস্তুত ও দাখিল করেন। সে সময় যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের রেজিস্ট্রার আপত্তি তুললেও মন্ত্রী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের চাপে তিনি নথি গ্রহণে বাধ্য হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কর ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ আড়াল করতে গত তিন দশকে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সচিবদের কোম্পানির বোর্ডে নিয়োগ বা মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজনীতিকদের লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে।

অভিযোগে করাচিভিত্তিক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে। এ জন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও করাচিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সহায়তায় নথি সংগ্রহের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুদকে আসা অভিযোগে এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।