বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় চাপে পুঁজিবাজারের ৩৪ ব্যাংক
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকই আগামীতে শেয়ারহোল্ডারদের নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা নতুন নির্দেশনার ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টিই নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার বাইরে চলে যেতে পারে।
ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় আগামী বছর থেকে দেশের অধিকাংশ ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, কোনও ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকার কম হলে তারা ২০২৬ সাল থেকে নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারবে না। একইসঙ্গে সব শর্ত পূরণ করলেও মোট লভ্যাংশের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ নগদ দেওয়া যাবে। গত শনিবার এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই নীতির ফলে ভালো আর্থিক ভিত্তি থাকা অনেক ব্যাংকও নগদ লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হবে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেবল ন্যাশনাল ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় তিন হাজার ২২০ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকটি মূলধন ঘাটতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে রয়েছে।
ফলে বাস্তবে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার অবস্থায় নেই। সে হিসেবে কার্যত একমাত্র ব্র্যাক ব্যাংকই নতুন শর্ত পূরণ করে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের মতো আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোও শুধু পরিশোধিত মূলধন দুই হাজার কোটি টাকার কম হওয়ায় নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি ব্যাংক খাতের শেয়ারের দামে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারী নিয়মিত নগদ লভ্যাংশের ওপর নির্ভর করেন, তারা এসব শেয়ারে আগ্রহ হারাতে পারেন।
বাজার বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিদ্যমান নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি করেছে। এনবিআরের একটি সার্কুলারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে নগদ লভ্যাংশ প্রদানে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নগদ লভ্যাংশ না দিয়ে অতিরিক্ত স্টক ডিভিডেন্ড দিলে করসুবিধা কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে এনবিআর নগদ লভ্যাংশ উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন শর্ত আরোপ করে তা সীমিত করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই নীতি প্রণয়নের আগে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও এনবিআরের মতো অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেছে কি না।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টিকে মূলত ব্যাংকের মূলধনভিত্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। কিন্তু পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথেষ্ট বিবেচনায় নেয়নি। ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে শুধু পরিশোধিত মূলধনকে মানদণ্ড করা যথাযথ নয়। কারণ, সব ব্যাংকের ব্যবসার ধরণ, ঝুঁকির মাত্রা ও সম্পদের গঠন এক নয়। কোনও ব্যাংকের মূলধন তুলনামূলক কম হলেও তার ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও, শেয়ারহোল্ডার’স ইক্যুইটি, প্রভিশন সংরক্ষণ এবং সম্পদের মান শক্তিশালী হতে পারে।
আবার উচ্চ পরিশোধিত মূলধন থাকলেই যে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। এর উদাহরণ হিসেবে ন্যাশনাল ব্যাংকের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেও বর্তমানে তা গভীর সংকটে রয়েছে। বিপরীতে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়েও প্রাইম ব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও ভালো অবস্থানে রয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে নগদ লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতাকে পরিশোধিত মূলধনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না করে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্য সূচকের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারত। যেমন: ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও, মূলধন সংরক্ষণ, খেলাপি ঋণের হার, প্রভিশনিং এবং শেয়ারহোল্ডার’স ইক্যুইটির ভিত্তিতে লভ্যাংশ নীতি নির্ধারণ করলে তা আরও বাস্তবসম্মত হতো। এদিকে, ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের বিষয়টিও উদ্বেগ তৈরি করছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ করে লভ্যাংশ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ২০২৬ সাল এবং পরবর্তী বছরগুলোতে এই নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। গত বছরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণায় কঠোর শর্ত আরোপ করেছিল। খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের বেশি, মূলধন ঘাটতি বা প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোকে লভ্যাংশ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে ৩৬টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত থাকলেও এর মধ্যে মাত্র দুটি ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে বাকি ৩৪টি ব্যাংক মূলধন বাড়াতে না পারলে তারা নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নগদ অর্থ বিতরণ সীমিত করে মূলধন সংরক্ষণের উদ্যোগ ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে ব্যাংক খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হতে পারে, কারণ নগদ লভ্যাংশকে অনেক বিনিয়োগকারী স্থায়ী আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।



