আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ পতনের পর হঠাৎ চাঙা হয়ে উঠেছে দেশের প্রধান দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। মুলত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের মাথায় স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে শুরু করছে দেশের পুঁজিবাজার।

ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল লুটপাট হওয়া পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। গত এক বছরে সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগে পুঁজিবাজার থেকে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

যার ফলে গত কয়েকদিনের তেজিভাবের কারণে ফের বাজারমুখী হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে বাজারে যে অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছিল, সেটা স্বস্তিকর অবস্থায় ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করছে। ফলে সূচকের উঠানামার মধ্যে স্থিতিশীল হচ্ছে পুঁজিবাজার। বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে লেনদেনের গতি। এতে লেনদেনে একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া আগস্ট মাসের শুরু থেকেই ধারাবাহিক ভাবে বাড়ছে দৈনিক লেনদেন।

এছাড়া প্রতিনিয়ত মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি লেনদেনের গতিও বাড়ছে। ফলে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গত সাড়ে ১২ মাসের মধ্যে রেকর্ড লেনদেন হলেও সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে সূচকের মিশ্র প্রবণতার মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। তবে সূচকের কিছুটা পতন হলেও বাজার নিয়ে আশাবাদী ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। যার ফলে পুঁজিবাজার চাঙা হওয়ার পেছনে প্রধানত পাঁচ কারণ বিদ্যমান বলে দৈনিক দেশ প্রতিক্ষণের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ এবং বড় ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কথায় এ পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম, সরকারের ইতিবাচক মনোভাব, ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়া এবং বড় বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা।

প্রথমত, মূলত দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করায় বাজারে সূচক ও লেনদেন বাড়ছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া ফেব্রুয়ারীতে নির্বাচন ইস্যুতে বড় বিনিয়োগকারীরা বাজারমুখী হয়ে লেনদেন বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, এ মুহূর্তে দেশে কোনো হরতাল বা অবরোধ না থাকায় বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ায় বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করছে। ফলে বাজারে চাঙাভাব লক্ষ্য করা গেছে।

দ্বিতীয়ত, মুলত ব্যাংক ও বীমা খাতের শেয়ারে পতন হলেও জুন ক্লোজিং কোম্পানির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে লভ্যাংশ ঘোষনাকে সামনে রেখে জুন ক্লোজিং কোম্পানির বিভিন্ন খাতের শেয়ারের প্রতি একটু বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে। জুন ক্লোজিং কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম হিসেবে পরিচিত। এখন অধিকাংশ দিন এসব কোম্পানির শেয়ারে সেল অর্ডার কম থাকে বা থাকেই না। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ায় বাজার চাঙা হয়ে উঠেছে।

তৃতীয়ত, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের মাথায় স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে শুরু করছে দেশের পুঁজিবাজার। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ ছিল লুটপাট হওয়া পুঁজিবাজারে সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। গত এক বছরে সরকারের সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উদ্যোগে পুঁজিবাজার থেকে হারানো আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। যার ফলে বিনিয়োগকারীরা ফের বাজারমুখী হচ্ছে।

চতুর্থত, ব্যাংকের ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়ার ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা না রেখে পুঁজিবাজারমখী হচ্ছেন সাধারন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কমানোর ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে সাধারন মানুষের। গত ১ জুলাই থেকে নতুন হার অনুযায়ী, সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন সুদহার হবে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

এছাড়া নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়েছে, মুদ্রানীতি কাঠামোর ইন্টারেস্ট রেট করিডর এর আওতায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কল মানি মার্কেট) এর কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা সুসংহত করার লক্ষ্যে নীতি সুদহার করিডরের নিম্ন সীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৮.৫০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ও সঞ্চয় পত্রের মুনাফা কমানোর ফলে আমানতকারীরা লাভের আশায় পুঁজিবাজারমুখী হবে।

পঞ্চমত, দীর্ঘদিন পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল থাকায় বাজারে নিস্কিয় ছিলেন ব্যক্তি শ্রেণির বড় বিনিয়োগকারী বা গেমলাররা। লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম ও বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারের ইতিবাচক মনোভাব এবং সঞ্চয় পত্র ও ব্যাংক মুনাফা কমানোর ফলে আবারও সক্রিয় হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের সক্রিয়তায় আবারও চাঙা হয়ে উঠেছে পুঁজিবাজার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসই’র এক সদস্য বলেন, সামনে নির্বাচনের কারণে পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগককারীরা। এছাড়া দেশের স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারদের আস্থা ফিরেছে। এছাড়া লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে।

এদিকে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় উত্থানের পর দ্বিতীয় কার্যদিবসে কিছুটা দরপতন হয়েছে। এদিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি কমেছে সবকটি মূল্যসূচক। একই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। কিন্তু মুনাফা তোলার চাপে সূচকের কিছুটা কারেকশন হয়েছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ১০ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৫৮৩ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ১ হাজার ২২৫ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৪ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৮৮ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৮ কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১১৯ টির, দর কমেছে ২৪৪ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৫ টির। ডিএসইতে ১ হাজার ১৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ১১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা কম। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২৯৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকার ।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬০৬ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৫০ টি প্রতিষ্ঠান লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮২ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৪১ টির এবং ২৭ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।