আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ মন্দা আর অনিশ্চয়তার পর দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আবারও আস্থা ফিরে আসতে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাস ধুঁকতে থাকা বাজারে হঠাৎ সূচকের উল্লম্ফন ও লেনদেনের মাত্রা বাড়ায় অনেকেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন। তাছাড়া এক কার্যদিবসের পতনের পর সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ফের সূচকের উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে।

মুলত বাজার কারেকশন হলেও ভালো মৌল ভিত্তি শেয়ারে ভর করে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। এতে ধীরে ধীরে আস্থা বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের। এছাড়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের বড় উত্থানের পাশাপাশি বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ার দর ও টাকার পরিমানে লেনদেন লেনদেন। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের উদ্যোগ স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ ও বিনিয়োগবান্ধব সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। এছাড়া বাজার উঠানামার মধ্যে দিয়ে স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে। পুঁজিবাজার একটানা বাড়ছে না তেমনি একটানা দরপতন হচ্ছে না। এটা বাজারের জন্য ইতিবাচক দিক।

মুলত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বাজারে গতি ফেরাতে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু সাহসী উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৫ দফা নির্দেশনায় বাজার সংস্কারের আশ্বাস বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা তৈরি করেছে।

এই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে: বহুজাতিক কোম্পানির সরকারি শেয়ারবাজারে ছাড়া, ভালো দেশীয় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেওয়া, বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে বাজার সংস্কার, অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং বড় কোম্পানিগুলোকে ঋণের বদলে শেয়ার বা বন্ড ছাড়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করা।

চলতি অর্থবছরের বাজেটেও পুঁজিবাজারবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের ব্যবধান বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করায় ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হচ্ছে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমানো এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারকে বিকল্প বিনিয়োগক্ষেত্র হিসেবে ভাবছেন।

এ ছাড়া সরকার পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) ১০ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদি ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ১০ হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপিটাল মার্কেট সাপোর্ট ফান্ড’ গঠনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ দুটি পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখবে।

একাধিক ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে ফিরে আসা আস্থা এখন অনেক স্পষ্ট। আগে যারা আশাহত হয়ে বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারাও এখন আবার বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। বিশেষ করে ভালো মৌল ভিত্তি কোম্পানির শেয়ার কিনতে আগ্রহ বাড়ছে।

পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী বলেন, পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে গত বাজেটের সময় থেকেই সরকারের দিক থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আমানত ও ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদের ঊর্ধ্বমুখী যে ধারা ছিল, সেটিও এখন কিছুটা স্থিতিশীল। নতুন করে সুদের হার না বেড়ে বরং কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এ কারণে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আবারও পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের উত্থানে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো ভালো কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাজার টেকসই ও স্থিতিশীল একটি রূপ পাবে। তবে ভালো শেয়ারের দামও যাতে অতিমূল্যায়িত না হয়ে যায়, সে জন্য এখন উচিত বাজারে ভালো শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সরকারের নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকে, কর কাঠামো আরও সহজ হয় এবং বাজারের স্বচ্ছতা বাড়ে, তবে পুঁজিবাজার আগামী এক-দুই বছরের মধ্যেই অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে।

জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ৩৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬২০ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৮ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ২৩৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৯৫ পয়েন্টে।

দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯৮ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ২২০ টির, দর কমেছে ১৩১ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪৭ টির। ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৯৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৮১ কোটি ১৩ লাখ টাকার ।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৫২ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৩৯ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ১৩৭ টির দর বেড়েছে, কমেছে ৭১ টির এবং ৩১ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।