এসএমই মার্কেটের দেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
কে এম চিশতি সিয়াম: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের যাত্রায় নতুন এক দিগন্তের নাম এসএমই (Small and Medium Enterprise) মার্কেট। যথাযথ দেখভালের অভাবে এই বাজারে গতি কমে যাচ্ছে। ২৩০০ থেকে ইন্ডেস্ক কমে এখন মাত্র ১০১০। তবে এটা মানতেই হবে এসএমই শুধু একটি বাজার নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা। দেশের উদ্যমী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য এসএমই মার্কেট এক অসাধারণ প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে।
কেন এসএমই মার্কেট এত গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশে প্রায় ৭৮% কর্মসংস্থান এসএমই সেক্টরের মাধ্যমে হয় এবং দেশের জিডিপির বড় একটি অংশও আসে এই খাত থেকে। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেক্টর দীর্ঘদিন ধরে মূলধন সংকটে ভুগছিল। ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা, জামানতের জটিলতা, এবং উচ্চ সুদের হার—সব মিলিয়ে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছিলেন না।
এই জায়গাতেই এসএমই মার্কেট এসে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। এখন উদ্যোক্তারা শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারছেন। এর ফলে যেমন ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে, তেমনি বিনিয়োগকারীরাও নতুন একটি সম্ভাবনাময় খাতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
QI কমানোর প্রয়োজনীয়তা: বর্তমানে এসএমই মার্কেটে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত বিশেষ করে যোগ্য বিনিয়োগকারী (Qualified Investor বা QI) নীতির কারণে। এসএমই সেগমেন্টকে আরও গতিশীল করতে হলে এই নীতিকে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে কমানো প্রয়োজন। কারণ যত বেশি অংশগ্রহণকারী এই মার্কেটে যুক্ত হবে, তত দ্রুত তারল্য ও আস্থা বাড়বে। BSEC এর উচিত বাস্তবতা বিবেচনা করে QI-এর সীমা শিথিল করা, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ধীরে ধীরে অংশ নিতে পারে এবং এসএমই সেক্টর আরও প্রাণবন্ত হয়।
ভালো পারফরমারদের মূল বোর্ডে আনার উদ্যোগ: এসএমই মার্কেটে ইতিমধ্যেই কিছু প্রতিষ্ঠান অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। সময় এসেছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল বোর্ডে (Main Board) স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়ার। এতে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা বাড়বে না, বরং বাজারে নতুন বিনিয়োগের ধারা তৈরি হবে।
এই প্রক্রিয়ায় সফল কোম্পানিগুলোকে মূল বোর্ডে স্থানান্তরের জন্য BSEC এর একটি স্বচ্ছ, সহজ ও সময়বদ্ধ নীতি নির্ধারণ করা জরুরি। এতে অন্য উদ্যোক্তারাও উৎসাহ পাবেন, এবং এসএমই মার্কেট হয়ে উঠবে নতুন কোম্পানির জন্মভূমি।
দেশের জন্য, বিনিয়োগের জন্য এসএমই মার্কেটকে ঢেলে সাজানো: বাংলাদেশ এখন দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে। এই রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি হতে পারে এসএমই মার্কেট। এজন্য দরকার কিছু মৌলিক পদক্ষেপ—
বিনিয়োগকারীর সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ:
১. তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করা
২. কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা
৩. স্বচ্ছতা ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার করা। এসব বাস্তবায়ন করা গেলে এসএমই মার্কেট শুধু পুঁজিবাজার নয়, দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে পরিণত হবে। এসএমই মার্কেট হচ্ছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ যেখানে স্বপ্ন, উদ্যোগ ও বিনিয়োগ মিলিত হচ্ছে একসাথে। এখন সময় এসেছে এই সেক্টরকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করে তোলার। দেশের উন্নয়নের জন্য, কর্মসংস্থানের জন্য, আর বিনিয়োগের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য—এসএমই মার্কেটই হতে পারে পরবর্তী বড় গেমচেঞ্জার।



