দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: চরম সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে ২০২৫ সাল পার করেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। কয়েক বছর ধরে চলমান বৈশ্বিক অনৈতিক মন্দা, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, অর্থ পাচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রক সংস্থার হুটহাট সিদ্ধান্তসহ বিভিন্ন কারণে মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি পুঁজিবাজার। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়তে হয়েছে বিনিয়োগকারীদের।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে আশা-নিরাশার দোলাচলে পার করছে বছর। ফলে নতুন বছরে স্টেকহোল্ডারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে পুঁজিবাজারে গতিশীল করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের প্রত্যাশা, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় নতুন বছরে পুঁজিবাজার যেন ঘুরে দাঁড়ায়। হারানো পুঁজি যেন ফিরে পান সেই প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের।

কারণ টানা দরপতনে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। সূচক ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। দিন যতই যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। আর বিএসইসি চেয়ারম্যান বাজার ভাল করার শুধু ফুলঝুঁড়ি ছুটছেন। বাজার ভাল তো দুরের কথা বরং দিন যতই যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের লোকসান ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকছে যে বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদে মতিঝিলের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
এদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে সরকার বদলের পর পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারী ও

বাজার অংশীজনরা নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন। তখন বিএসইসির নেতৃত্বের বদল ঘটে। এরপর কেটে গেল ১৫ মাস। এ সময়ে বাজার সংস্কারে যত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে দেখা যাচ্ছে ধীরগতি। এছাড়া পুঁজিবাজার সংস্কারের নামে বাজারকে আরো অস্থিতিশীল করছে। সেই স্থবিরতার ভুক্তভোগী হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সবাইকে আস্থায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবো।

এছাড়া আস্থাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও অনেকটা নিস্কিয় হয়ে পড়েছেন। ফলে বাজারে ক্রেতার সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের শেয়ার জোরপূর্বক বিক্রি বা ফোর্সড সেলের আওতায় পড়ছে। বাজার যত নিচে নামছে, ফোর্সড সেলের চাপও তত বাড়ছে।

২০১০ সালের ধসের পর থেকে পুঁজিবাজারে এমন পরিস্থিতিই চলছে। মাঝে মধ্যে অবশ্য কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও সেটি স্থায়ী হয় না, যার কারণে হঠাৎ আশার ঝিলিক দেখা গেলেও আবার হতাশার মুখোমুখি হতে হয় বিনিয়োগকারী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা ।

একাধিক শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে বলেন, পুঁজিবাজারই ঠিকভাবে চলছে না। বাজার কোন দিকে যাচ্ছে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিনিয়োগকারী এবং বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কেউ দিক নির্দেশনা পাচ্ছেন না। একদিকে বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারাচ্ছেন, অন্যদিকে লেনদেন কমে যাওয়ায় ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ সব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান আয় হারিয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বাজারে নানা ধরনের অনিয়ম চলে আসছে। তাই বাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু রাতারাতি ও এককভাবে কারও পক্ষে বাজার থেকে সব অনিয়ম দূর করা কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজই করতে হবে বাজার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে ধীরে ধীরে।

অনিয়ম ও কারসাজি বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে যারা কারসাজি করে পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাই এখন জরুরি।