স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে অনেক গ্রাহক তাদের পাওনা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেন, শর্তের মারপ্যাঁচে আটকে গেছে তাদের গচ্ছিত আমানত। ব্যাংকে সেই আমানত গচ্ছিত থাকলেও তারা নিজেদের প্রয়োজনে তুলতে পারছেন না।

এ প্রসঙ্গে এক্সিম ব্যাংকের সাতমসজিদ রোড শাখার গ্রাহক মো. ফরহাদ বলেন, আমার সঞ্চয়ী হিসাবে ৫ লাখ টাকা রয়েছে। সেই সঙ্গে আমার একটি ডিপিএসও চালু রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী আমি আমার সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ লাখ টাকা উত্তোলন করতে চাইলে ব্যাংক আমাকে কোনো টাকা দেয়নি। কারণ হিসেবে তারা বলছে, সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা থাকলেও ডিপিএস হিসাব থাকায় আমি কোনো টাকা উত্তোলন করতে পারব না।

ইউনিয়ন ব্যাংকের কক্সবাজার শাখার গ্রাহক আলিফ রেজা বলেন, আমি ইউনিয়ন ব্যাংকে ১৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রেখেছিলাম, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৫ ডিসেম্বর। গত ২২ ডিসেম্বর মুনাফাসহ আমার আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ লাখ টাকা। সেই টাকা আমার সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হলেও আমি কোনো টাকা তুলতে পারছি না। কারণ হিসেবে আমাকে বলা হয়েছে, ৪ নভেম্বরের পর যেসব স্থায়ী আমানতের মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেই টাকা এখনই গ্রাহক তুলতে পারবেন না।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখার অপর এক গ্রাহক মো. ইউসুফ বলেন, আমার স্মার্ট আইডি কার্ড না থাকায় আমাকে টাকা দেওয়া হয়নি। এর মানে এখনো আমি ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। কারণ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ব্যাংক যেভাবে বলেছিল, সেভাবেই তো খুলেছি। এখন কেন এমন কথা বলছে তা আমার বোধগম্য নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিজ্ঞ ব্যাংকার এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, আমানতকারীরা এতদিন যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ছিলেন, অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে সেটি কিছুটা হলেও কমেছে। তবে ছোট-বড় বা যৌক্তিক-অযৌক্তিক বিভিন্ন শর্তের কারণে অনেক গ্রাহক টাকা তুলতে পারছেন না, এটি দুঃখজনক। আমানতকারীদের ভোগান্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে এসব শর্ত আরও নমনীয় করা যায় কি না,

সে বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি। এ বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ডিপিএস হিসাবের কারণে সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা তুলতে পারবে না এটি একেবারেই অযৌক্তিক। তা ছাড়া গ্রাহককে যদি ব্যাংক চিহ্নিত করতে পারে, তাহলে স্মার্ট এনআইডি ছাড়াও আমানত ফেরত দেওয়া উচিত।

এদিকে পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক গঠনের চূড়ান্ত নীতিমালা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে অধিগ্রহণ করেছে নবগঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক’। সেই অনুযায়ী এসব ব্যাংকের যত শাখা রয়েছে, সব জায়গায় সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকের লোগো এবং সাইনবোর্ডও লাগানো হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারী, যাদের চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাবে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে, তারা প্রথম দিনই টাকা তুলতে পারছেন। তবে ২ লাখ টাকার বেশি আমানতের জন্য ২৪ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে উত্তোলন করা যাবে। সাধারণ আমানতকারীদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে পরবর্তী ১ লাখ টাকা পর্যন্ত স্কিম কার্যকর হওয়ার তিন মাস পর তোলা যাবে। এরপর ১ লাখ টাকা করে স্কিম কার্যকরের পরের ৬ মাস, ৯ মাস, ১২ মাস, ১৫ মাস, ১৮ মাস, ২১ মাস পর তোলা যাবে। বাকি পুরো অর্থ তোলা যাবে ২৪ মাস পর।

এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের চলতি ও সঞ্চয়ী আমানতের ক্ষেত্রেও একই সূচি প্রযোজ্য হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ আমানতকারীদের মেয়াদি ও স্থায়ী আমানতের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব আমানতকারী চাইলেও নির্ধারিত মেয়াদের আগে তা তুলতে পারবেন না। শুধু তা-ই নয়, মেয়াদপূর্তি হলেও গ্রাহকের ইচ্ছানুযায়ী তা তোলা যাবে না। তাদের স্থায়ী আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ বা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

তিন মাস মেয়াদি স্থায়ী আমানত স্কিম কার্যকর হওয়ার পর তিনবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। ৩-৬ মাস মেয়াদি আমানত দুবার, ৬-১২ মাস মেয়াদি আমানত দুবার স্কিম কার্যকর হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। এ ছাড়া এক-দুই বছর মেয়াদি আমানত তিন বছর মেয়াদি আমানতে রূপান্তরিত হবে। দুই-তিন বছর মেয়াদি আমানত চার বছর মেয়াদি এবং তিন-চার বছর মেয়াদি আমানত পাঁচ বছর মেয়াদি আমানতে রূপান্তরিত হবে।

এ ছাড়া চার বছরের বেশি মেয়াদি আমানত মেয়াদপূর্তি শেষে পরিশোধযোগ্য হবে। তবে ক্যানসার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য স্কিমে মানবিক বিবেচনায় বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। তারা তাদের চিকিৎসার প্রয়োজনে নির্ধারিত সময়সীমা বা সীমার বাইরে গিয়েও আমানতের অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, আমানত উত্তোলনের তালিকায় শুধু ব্যক্তিগত (একক) আমানতকারীরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, যাদের নামে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে এবং যাদের কোনো এমটিডিআর বা স্কিম হিসাব নেই। বর্তমানে শুধু যেসব আমানতকারীর ভেরিফায়েড স্মার্ট আইডি কার্ড ও পুরোনো এনআইডি (ঘওউ) রয়েছে, তারাই অর্থ উত্তোলনের সুবিধা পাবেন। তবে ডরমেন্ট হিসাব, যেসব হিসাবে প্রয়োজনীয় কেওয়াইসি ডকুমেন্ট নেই,

অর্থাৎ যেসব হিসাব পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে খোলা হয়েছে এবং যাদের যৌথ হিসাব রয়েছে তারা কোনো টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না। তাদের বিষয়ে পরে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে। এ ছাড়া কোনো আমানতকারীর একাধিক চলতি/সঞ্চয়ী হিসাব বিদ্যমান থাকলে সংশ্লিষ্ট সব হিসাবের মোট স্থিতি একত্র করে এবং প্রযোজ্য সব দায় সমন্বয়পূর্বক তার জন্য উত্তোলন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সেই সঙ্গে আমানতকারীদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের উত্তোলন সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখকে ভিত্তি তারিখ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যদি ৪ নভেম্বরের পর হিসাবের স্থিতি বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, তবে উত্তোলন সীমা হিসেবে ৪ নভেম্বর স্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে।

আর যদি ২৪ ডিসেম্বর হিসাবের স্থিতি কমে যায়, তবে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের স্থিতিকেই উত্তোলন সীমা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ যদি কোনো আমানতকারীর ৪ নভেম্বরের স্থিতি ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা হয় এবং বর্তমানে স্থিতি কমে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হয়, তবে তিনি বর্তমান স্থিতির সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

যদি কোনো আমানতকারীর ৪ নভেম্বর স্থিতি থাকে ৫ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে উত্তোলন করেছেন ৫০ হাজার টাকা এবং বর্তমানে স্থিতির পরিমাণ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তবে তিনি উত্তোলন করতে পারবেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে যদি কোনো আমানতকারীর ৪ নভেম্বর স্থিতি ৫ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে উত্তোলন করেছেন ৩ লাখ টাকা এবং বর্তমানে স্থিতির পরিমাণ ২ লাখ টাকা, তবে তিনি কোনো টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না।