নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবসে পুঁজিবাজার ‘প্রত্যাশার বারুদ’
আলমগীর হোসেন, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও রাজনৈতিক মেরুকরণসহ নানা অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হওয়ায় নতুন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যার ফলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটতেই ঘুরে দাঁড়াল দেশের পুঁজিবাজার।
মুলত সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগমুখী হচ্ছেন। যার প্রভাবে পুঁজিবাজারে নতুন করে গতি ফিরতে শুরু করেছে। ফলে নির্বাচন পরবর্তী সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচক ও লেনদেনের বড় উত্থানে শেষ হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন পর বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে ।
মুলত ব্যাংক ও আর্থিক খাত এবং বীমা খাতের শেয়ারের একচেটিয়া প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এর ফলে লেনদেনের প্রথম পাঁচ মিনিটেই অর্ধশতাধিক কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় (সার্কিট ব্রেকার) পৌঁছে যায়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে ‘প্রত্যাশার বারুদ’।
এর ফলে একদিনেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বাজার মূলধন বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপরে। পাশাপাশি পাঁচ মাস পর হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের দেখা মিলেছে। অন্য পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূচকের বড় উল্লম্ফন হয়েছে। বাজারটিতে প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে প্রায় ৫০০ পয়েন্ট।
এদিকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় দেশের পুঁজিবাজারে নতুন করে আশার সঞ্চার হচ্ছে। আস্থাহীন ও অনিশ্চয়তার কারণে গতিহীন হয়ে পড়া পুঁজিবাজারে গতি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক দল সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় আগামী কয়েকদিন পুঁজিবাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে। নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নিয়ে যদি বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে পারে, তাহলে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থায়ী হতে পারে। তারা আরও বলছেন, বাজারে এখন আস্থার সংকট হবে না। তবে বাজারের গতি ফেরাতে এবং ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধরে রাখতে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন সরকারের জন্য পুঁজিবাজারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে ভালো ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মন্দার কারণে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার দাম এখন অবমূল্যায়িত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাজারে টাকার অভাব হবে না। পুঁজিবাজারে মন্দার মূল কারণ ছিল আস্থার সংকট। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার কারণে এই আস্থা সংকট এখন এমনিতেই কেটে যাবে। বিনিয়োগের জন্য সাইড লাইনে বসে থাকা অনেক বিনিয়োগকারী এখন সক্রিয় হবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসইর এক সদস্য বলেন, পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা বাড়ায়। এখন প্রয়োজন নীতিগত ধারাবাহিকতা ও অর্থনৈতিক সংস্কারের স্পষ্ট বার্তা। নির্বাচন ঘিরে অনেকেই নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত ছিলাম। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ বাড়বে।
অভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীর মতে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং নতুন সরকারের দ্রুত নীতিগত দিকনির্দেশনার আশায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ক্রয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। নির্বাচনের আগে টানা কয়েক মাস অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার কারণে বাজারে স্থবিরতা ছিল। অনেক বিনিয়োগকারী সাইডলাইনে ছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর তারা নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
জানা গেছে, দিনশেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স আগের দিনের চেয়ে ২০০ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে। আর ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩০ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে এবং ডিএসই ৩০ সূচক ৮৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে।
দিনভর লেনদেন হওয়া ৩৯২ কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ৩৬৪ টির, দর কমেছে ২৬ টির এবং দর অপরিবর্তিত রয়েছে ৪ টির। ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যা আগের কার্যদিবস থেকে ৪৮৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বেশি। এর আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ৭৯০ কোটি ১৫ লাখ টাকার।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫১৮ পয়েন্টে। সিএসইতে ২৪৭ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ২২০ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৭ টির এবং ১০ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।



