শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর্থিকখাত। বিশেষ করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকিং খাতে নানামুখী সংস্কার ও পদক্ষেপের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলেও আর্থিকখাতের আরেক চালিকাশক্তি পুঁজিবাজারে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান। ক্রমান্বয়ে পুঁজিবাজার ডুবতে বসেছে। স্পর্শকাতর এই খাতটির সঙ্গে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি বিনিয়োগ জড়িত, প্রতিদিনের লেনদেনের প্রতিফলন ঘটে সূচক উঠা-নামার মাধ্যমে, ফলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াটিও সূচকের সমান্তরাল রেখায় প্রতিফলিত হয়।

সূচক ও লেনদেন তলানিতে নামছে, যেন দেখার কেউ নেই। অবশ্য এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের খামখেয়ালীপনা, বাজার সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব, নানা হঠকারী সিদ্বান্ত, ব্যক্তিগত অভিপ্রয়াস, পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে অবমূল্যায়ন, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানাবিধ কারণে দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ধ্বংসের দারপ্রান্তে।

বিশেষ করে বাজারকে স্থিতিশীল করতে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে আগের সময়ের ছোট ছোট ভুল ত্রুটিকে সামনে এনে বড় অঙ্কের জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তির মাধ্যমে বাজারকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে। তবে সবার প্রত্যাশা ছিলো নির্বাচনের পর বাজার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পালাবদলে পুঁজিবাজারে ফিরেছে প্রত্যাশার হাওয়া। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে এমন স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী ফের পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। টানা চার কার্যদিবস দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে পুঁজি হারানোর শঙ্কা বইছে।

কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম কার্যদিবস দেশের পুঁজিবাজারে সূচকের বড় উত্থান দেখা গেলেও নির্বাচনের পর টানা চার কার্যদিবসে সূচকের দরপতনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিলো বিএনপি সরকার গঠনের পর পুঁজিবাজার ভালো হবে।

তবে ভালো তো দুরের কথা এখন টানা দরপতন ঘটছে। মুলত নির্বাচিত সরকারের সম্ভাব্য নীতি ও নিয়ন্ত্রক অবস্থান নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপে সূচকের দরপতন হচ্ছে। এছাড়া রেগুলেটরি সংস্কার ছাড়া পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

ফলে বিনিয়োগকারীদের মাঝেও বাজার নিয়ে নতুন আশার আলোর ভেতরেই আসছে আরেকটি প্রশ্ন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বর্তমান চেয়ারম্যান থাকছেন তো? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন, বিনিয়োগকারীদের আড্ডা, বোকারেজ হাউজগুলোর অফিস, সব জায়গায় একই আলোচনা।

নতুন সরকারের সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে কি না এ নিয়েই নানা মনে চলছে জল্পনা-কল্পনা। অথচ সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এখনো বহাল তবিয়তেই দায়িত্বে আছেন। তিনি নিজে পদত্যাগ করবেন কিনা, কিংবা নতুন সরকার তার ওপর আস্থা রাখবেন কি না এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই।

অতীতে বিএসইসির নেতৃত্বে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নানা বিতর্ক, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি তৈরি করেছিলেন। তবে এই দিক বিবেচনায় খন্দকার রাশেদ মাকসুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ড. মুহম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির এক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাস্তি প্রত্যাহার করলেও তা গোপন রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বাজার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাশেদ মাকসুদ বাজার স্থিতিশীল রাখা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। ফলে বাজার গিয়ে পৌঁছেছে তলানিতে। পাশাপাশি সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার গত ১৭ মাসে বেশি সময় অতিবাহিত হলেও তিনি একটিও প্রথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বাজারে আনতে পারেননি।

নানা গুঞ্জনের চাপে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্বপদে থাকবেন নাকি পদত্যাগ করবেন? বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেও নিশ্চিত হতে পারেনি আমাদেও প্রতিনিধি। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনের ফোন দিয়ে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে, বিএসইসি প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়ার আগেই এই মূহুত্বে বাজারের স্বার্থে কেমন সংস্থা প্রধান নিয়োগ দেয়া উচিত সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বাজার সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাজার কিংবা বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্য থেকেই পুঁজিবাজারের নেতৃত্ব বাছাই করা হয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিএসইসির শীর্ষপদে নিয়োগ দেয়ার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।