আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি করে অর্থ প্রত্যাহার নতুন ঘটনা নয়, তবে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রবণতা বাজারে একধরনের কাঠামোগত চাপ তৈরি করেছে। দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ সাম্প্রতিক সময়ে ধীরগতিতে চলছে। মুলত কয়েক মাস ধরে বিদেশিদের পুঁজিবাজার ছাড়ার যে ধারা চলছে, তা এখনও থামেনি। তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্যান্য খাতের মতো পুঁজিবাজারে আশার আলো দেখা যায়। নতুন করে আসতে শুরু করে বিদেশি বিনিয়োগ।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্ভাব্য সংস্কারের আশায় আসা এই বিনিয়োগে সাময়িকভাবে সক্রিয় হয় দেশের পুঁজিবাজার। ফলে আগস্টের পুরো সময় ইতিবাচক ধারা দেখা যায়। তবে বেশিদিন অটুট থাকেনি এ ধারা। আগস্টে শুরু হওয়া বিনিয়োগ জানুয়ারিতে এসে ভাটায় পড়ে। বেশিরভাগ বিদেশি বিনিয়োগকারী তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর থেকে বিদেশী বিনিয়োগে টানা ভাটা পড়েছে। মুলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আস্থা না থাকায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাজারবিমুখ হয়ে পড়েন।

মুলত চার ইস্যুতে পুঁঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে ধীরগতি: ডলারসংকট, মুদ্রার বিনিময় হার অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কিছুটা কমে এসেছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখনো সীমিত। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও বাজারের আকার বিবেচনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ এখনো উন্মুক্ত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আচরণ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পূর্বানুমেয়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু গত এক বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিনিময় হার অস্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ধীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিদেশীদের কাছে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ দ্রুত কমে যাচ্ছে।
তবে বিদেশী বিনিয়োগকারী কমলেও বাড়ছে দেশী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা।

দেশের পুঁজিবাজারে প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বেনিফিসিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব বেড়েছে ২৬০টি করে। এতে বছরের প্রথম দেড় মাসেই ৮ হাজারের বেশি বিও হিসাব বেড়ে গেছে। সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারে বিও হিসাব বাড়লেও বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে। অর্থাৎ তাদের পুঁজিবাজার ছাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজারে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমছিল। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজার ছাড়তে থাকেন। যা অব্যাহত থাকতে দেখা যাচ্ছে চলতি বছরেও। চলতি বছরের ৩২ কার্যদিবসে বিদেশি ও প্রবাসীদের বিও হিসাবে কমেছে ৪৪৩টি। বিপরীতে সার্বিক বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৩৩৪টি।

সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে (১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯টি। যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৬ লাখ ৪০ হাজার ৩৭৫টি। এ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম দেড় মাসে পুঁজিবাজারে বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৩৩৪টি। এখন পর্যন্ত চলতি বছরে ৩২টি কার্যদিবস পার হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে বিও হিসাব বেড়েছে ২৬০টি।

এদিকে বর্তমানে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ৪৩ হাজার ১০৬টি। যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ৪৩ হাজার ৫৪৯টি। অর্থাৎ চলতি বছরে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব কমেছে ৪৪৩টি। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ১৪ জন বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজার ছেড়েছেন।

বিদেশিদের বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ছাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে। ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব ছিল ৫৫ হাজার ৫১২টি। এ হিসাবে ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবরের পর দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি ও প্রবাসীদের নামে বিও হিসাব কমেছে ১২ হাজার ৪০৬টি। বিদেশি ও প্রবাসীরা দেশের শেয়ারবাজার ছাড়লেও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

সিডিবিএলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশি বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৫৯টি, যা ২০২৫ সাল শেষে ছিল ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৩টি। অর্থাৎ চলতি বছরে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে ৮ হাজার ৬৩৬টি। এ হিসাবে প্রতি কার্যদিবসে গড়ে স্থানীয় বিও হিসাব বেড়েছে ২৭০টি।

এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বাড়লেও এর আগে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়েছেন। ২০২৪ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৫৫১টি। আর বর্তমানে বিও হিসাব আছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০৯টি। অর্থাৎ ২০২৪ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিও হিসাব কমেছে এক লাখ ২৪ হাজার ৮৪২টি।

বর্তমান পুঁজিবাজারে যেসব বিনিয়োগকারী আছেন, তার মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের নামে বিও হিসাব আছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৫৩০টি। গত বছর শেষে এই সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৩টি। অর্থাৎ চলতি বছরে পুরুষ বিনিয়োগকারীর হিসাব বেড়েছে ৬ হাজার ৭৮৭টি। বর্তমানে নারী বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার ২৩৫টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯টি।

এ হিসাবে চলতি বছরে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব বেড়েছে এক হাজার ৪০৬টি। নারী-পুরুষ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি চলতি বছরে কোম্পানির বিও হিসাবও বেড়েছে। বর্তমানে কোম্পানি বিও হিসাব রয়েছে ১৭ হাজার ৯৪৪টি। ২০২৫ সাল শেষে এই সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৮০৩টি। এ হিসাবে চলতি বছরে কোম্পানি বিও হিসাব বেড়েছে ১৪১টি।

বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের যে বিও হিসাব আছে তার মধ্যে একক নামে আছে ১১ লাখ ৯০ হাজার ৩৪৩টি। ২০২৫ সাল শেষে যা ছিল ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭১৫টি। অর্থাৎ চলতি বছরে একক নামে বিও হিসাব বেড়েছে ৭ হজার ৬২৮টি। বিনিয়োগকারীদের যৌথ নামে বিও হিসাব আছে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪২২টি। ২০২৫ সাল শেষে যৌথ বিও হিসাব ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮৫৭টি। অর্থাৎ চলতি বছরে যৌথ বিও হিসাব বেড়েছে ৫৬৫টি।