এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডি বিরুদ্ধে অনিয়মের ফিরিস্তি
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানি এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তৌহিদুল আলম খানের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বেচ্ছাচারিতা, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সিনিয়র কর্মকর্তাদের অপসারণ, ব্যাংকের অর্থের অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ব্যাংকটির চারজন শেয়ারহোল্ডার।
ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে সাইদুর রহমান এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। এতে শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করেছিলেন।
তবে তাদের দাবি, সংস্কারের নামে বর্তমানে ব্যাংকটিতে নজিরবিহীন দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে। এমনকি ব্যাংক লুটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই পুনরায় পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের আমলে যাঁরা ব্যাংকটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন, তাঁদেরই চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও এমডির নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে ব্যাংকটিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কার্যত জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সঙ্গে একাধিক পত্রালাপের পর পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলেও নতুন পর্ষদ ব্যাংকের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শাসন কাঠামোয় দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেনি। পাশাপাশি বর্তমান চেয়ারম্যান ও এমডির অতীত কর্মকাণ্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশন-এর নথিপত্র পর্যালোচনা করলে তাঁদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগের তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে; বিশেষ করে ড. মো. তৌহিদুল আলম খানের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক কর্মস্থলে অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন আবু মোহাম্মদ সাইদুর রহমান (২.৬ শতাংশ শেয়ার), সফিকুল আলম (২.২২ শতাংশ শেয়ার), লকিয়ত উল্লাহ (২.১৮ শতাংশ শেয়ার) ও মোহাম্মদ নাজিম (৩.৮৭ শতাংশ শেয়ার)। তারা দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হলেও প্রত্যাশিত সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম বেড়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ৫ মে বর্তমান এমডি দায়িত্ব নেওয়ার পর নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। পরিকল্পিতভাবে শূন্যপদ সৃষ্টি করে সেখানে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতি নিয়োগে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে এবং তাদের স্থলে নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। স্বল্প সময়ে কোম্পানি সেক্রেটারি, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, চিফ রিস্ক অফিসার, চিফ হিউম্যান রিসোর্স অফিসারসহ ৩৮টি উচ্চপদে নিয়োগ সম্পন্ন বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার (এমটিও) নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু প্রার্থী সরাসরি চেয়ারম্যান ও এমডির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিয়োগ পেয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত চেয়ে তারা দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের বিআরপিডি সার্কুলার নং–১৭ অনুযায়ী ব্যাংকটি বর্তমানে পিসিএ কাঠামোর আওতায় ক্যাটাগরি ৩ অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় নিয়োগ ও ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত নীতি অনুসরণের কথা থাকলেও বাস্তবে ব্যাপক নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
পিসিএ (Prompt Corrective Action–PCA) কাঠামো হলো বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রবর্তিত একটি বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা, যা দুর্বল আর্থিক সূচকবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এই কাঠামো মূলধন, সম্পদের গুণমান এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকের ঝুঁকি হ্রাস এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কাজ করে।
শেয়ারহোল্ডারদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৮২০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫৭ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে আরটিজিএস সেবার ফি মওকুফ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন এবং ঘনঘন বোর্ড সভার কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মন্দ ঋণ (এনপিএল) পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। নারী কর্মীদের প্রতি অসদাচরণের অভিযোগও অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বিজ্ঞাপন ও টিভিসি ব্যয়ের একটি অংশের অপব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরকে প্রভাবিত করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যাংকে নিয়োগ বা অন্য বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে দেখা হয়। অভিযোগের সত্যতা মিললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পিসিএ কাঠামোর আওতায় থাকা কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা জরুরি। বড় পরিসরে নিয়োগ পরিচালন ব্যয় বাড়াতে পারে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই এখন দৃষ্টি শেয়ারহোল্ডারদের।



