বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে পরিবর্তনের আভাস, নতুন চেয়ারম্যান খুঁজছে
শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: শেখ হাসিনা সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সবার প্রত্যাশা ছিলো বাজার ভাল হবে। তেমনি তাদের প্রত্যাশা ছিল, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুঁজিবাজারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা বাজারে আস্থা ফেরাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন।
মুলত সরকারের ঘোষিত সংস্কার পদক্ষেপগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসে পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে অধিকাংশ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তবে নতুন সরকার আসার পর সবার মাঝে একটাই প্রত্যাশা এবার পুঁজিবাজার ভালো হবে। কারণনির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্ব। এই সংস্থার চেয়ারম্যান পদেও কি পরিবর্তন আসছে সেদিকে নজর বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের।
তবে নির্বাচন-পরবর্তী প্রাথমিক উচ্ছ্বাস কাটিয়ে পুঁজিবাজার এখন কিছুটা থমথমে। এর মূল কারণ হিসেবে বাজার সংশ্লিষ্টরা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)’র শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের জোরালো সম্ভাবনাকে দেখছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে নতুন সরকার ইতিমধ্যে নতুন চেয়ারম্যানের সন্ধান শুরু করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কমিশনের কার্যক্রমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যর্থ হওয়ায় বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখায় বাজার গতিহীন হয়ে পড়েছে। তাঁর মেয়াদে কোনো নতুন আইপিও বাজারে আসেনি এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার ‘অবাস্তব’ জরিমানা আরোপ করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
মুলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আর্থিক খাতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন নিয়োগ দিয়েছিল। সেই ঝটকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরকে। একই সময়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে আর্থিক খাতে পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে। মনসুরকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে বসানো হয়েছে মো. মোস্তাকুর রহমানকে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজারকে ঢেলে সাজানো এবং বাজারকে গতিশীল ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার দিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দলের দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছেন। নতুন করে গুছিয়ে কাজ শুরু করতে বিএসইসির শীর্ষ পদেও কি বদল আনছে সরকার? তাই যদি হয়, তাহলে কে হচ্ছেন নতুন চেয়ারম্যান? এই আলোচনা এখন পুঁজিবাজারসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে শোনা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রয়োজনে আরো পরিবর্তন হবে। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর বিনিয়োগকারী মহলে ধারণা জোরালো হয়েছে, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তন আসতে পারে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, কমিশনের শীর্ষ পদে চেয়ারম্যান নিয়োগ পেতে এখন পর্যন্ত অন্তত অর্ধ ডজন সুপারিশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পাওয়ার পর দায়িত্ব না নেওয়া বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাশুরুর রিয়াজ। বিশ্বব্যাংকের সাবেক এই অর্থনীতিবীদ অবশ্য বিএসইসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে আসতে রাজি নন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি প্রয়োজনে সরকারকে সব ধরণের পরামর্শ দিবেন।
তবে বিএসইসি চেয়ারম্যান পদে যেতে ইচ্ছুক নন। কারণ বিএনপি সরকার গঠন করার পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অচিরেই আগের মতো বাজার ফিরবে। কিন্তু বিএসইসি’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার ফেরানোর চিন্তা অযৌক্তিক। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এইখাতে বিশেষ নজর থাকতে হবে। অন্যথায় বাজার ফেরানোর সুযোগ নেই।



