শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক নামে একীভূত হওয়া ৫টি ইসলামি ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ কীভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে ফেরত দেওয়া যায়, সে বিষয়ে নীতিগত ও কারিগরি বিশ্লেষণ শুরু করেছে সরকার। ব্যাংকটির চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, আর্থিক স্থিতি এবং বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আলোকে শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি পর্যালোচনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শেয়ার ফেরতের ক্ষেত্রে শেয়ারের বাজারদর নাকি অভিহিত মূল্য (ফেস ভ্যালু) ভিত্তি ধরা হবে এ নিয়ে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ চলছে। শেয়ারসংখ্যা, হালনাগাদ মালিকানা কাঠামো, সম্ভাব্য আর্থিক দায় এবং পুনর্গঠন-পরবর্তী আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য, বাস্তবসম্মত ও আইনসম্মত পদ্ধতি নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, শেয়ারমূল্য নির্ধারণের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক হিসাবের বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে আইনগত ও নীতিগত প্রশ্ন। যদি বাজারদরকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে সেই সময়কার বাজারের বাস্তব চাহিদা-জোগান, বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটবে। তবে বাজারদর অনেক সময় অস্বাভাবিক ওঠানামার শিকার হয় বিশেষ করে আর্থিক সংকট, অনিশ্চয়তা বা গুজবের প্রভাবে।

সে ক্ষেত্রে বাজারদর শেয়ারের অন্তর্নিহিত বা প্রকৃত মূল্য পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও করতে পারে। অন্যদিকে অভিহিত মূল্য ধরে হিসাব করলে স্থিতিশীল ও নির্ধারিত ভিত্তি পাওয়া যায়। কিন্তু ফেস ভ্যালু কোম্পানির প্রকৃত সম্পদমূল্য, দায় বা আর্থিক কর্মক্ষমতার সঠিক প্রতিফলন নয়। ফলে কোন পদ্ধতিতে শেয়ারহোল্ডাররা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন সেই ভারসাম্য নির্ধারণই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে সদ্যবিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের মতামত আলোচনায় রয়েছে। তিনি বলেছেন, আর্থিক খাতের যেকোনো পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় আইনি কাঠামো ও আর্থিক ন্যায্যতা একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। তার মতে, শেয়ারধারীদের অধিকার যেমন স্বীকার করতে হবে, তেমনি তাদের দায়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো ব্যাংক পুনর্গঠন বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলে মালিকানাগত প্রশ্ন এড়িয়ে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

বাজারভিত্তিক মূল্য ও অভিহিত মূল্যের প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ-দায় বিশ্লেষণ জরুরি বলেও তিনি মত দেন। ব্যাংকের নিট সম্পদ, আর্থিক অবস্থান, সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ এবং পুনর্গঠনের রূপরেখা বিবেচনায় না আনলে এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং অন্য পক্ষ অযথা সুবিধাপ্রাপ্ত হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে।

এরপর তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুনরায় বৈঠকে বসবেন বলে জানা গেছে। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ ফেরতের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে গিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। তা হলো- ব্যাংকের বর্তমান আইনগত অবস্থান কী, শেয়ারহোল্ডারদের দাবির পরিধি কতটুকু এবং নির্ধারিত শেয়ারমূল্য আইনি পরীক্ষায় টিকবে কি না।

বাজারদরকে ভিত্তি ধরা হলে কোন তারিখের দর গ্রহণযোগ্য হবে সর্বশেষ লেনদেন দিনের, নাকি নির্দিষ্ট সময়ের গড় মূল্য? আবার যদি অভিহিত মূল্য ধরা হয়, তাহলে শেয়ার ইস্যুর শর্তাবলি, কোম্পানির নিবন্ধন দলিল এবং পূর্ববর্তী করপোরেট সিদ্ধান্তগুলোও পর্যালোচনা করতে হবে। প্রশাসনিক দিক থেকেও কাজটি সহজ নয়। শেয়ারসংখ্যা যাচাই, হালনাগাদ শেয়ার রেজিস্টার প্রস্তুত, অনাদায়ী লেনদেন বা আইনি জটিলতা চিহ্নিত করা এসব ধাপে সময় লাগছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলছে, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।

সবশেষে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়, শেয়ারহোল্ডারদের কতটুকু এবং কীভাবে অর্থ দেওয়া হবে। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থান যদি দুর্বল হয়, তাহলে সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত। পুনর্গঠন-পরবর্তী ইকুইটি রূপান্তর, নতুন শেয়ার ইস্যু, পর্যায়ক্রমিক পরিশোধ কিংবা বিশেষ পুনর্বিন্যাস তহবিল এসব বিকল্পও আলোচনায় থাকতে পারে, যদিও এখনও কোনো চূড়ান্ত প্রস্তাব ঘোষণা হয়নি।

অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, দায় পরিশোধের জন্য কোন খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে—তার উৎস নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থের উৎস নির্ধারণ ছাড়া পুরো উদ্যোগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।