২৪-২৫ অর্থবছরে আয়ের ঘাটতিতেও মুনাফায় এগিয়ে বিএসইসি
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একটি অলাভজনক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। যা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তারপরেও সংস্থাটির বিভিন্নভাবে আয়ের মাধ্যমে নিয়মিত নিজস্ব তহবিল (ফান্ড) বাড়াচ্ছে। কিন্তু এর অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো আয় কমে ও বিএসইসির নির্ধারিত বিভিন্ন ফি দিতে গিয়ে নিয়মিত সংকুচিত হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই বাজার থেকে ব্যবসা করে মুনাফা করার জন্য এসেছে।
ফলে পুঁজিবাজার গত কয়েক বছর ধরে মন্দা। এরমধ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরে পুঁজিবাজারে ভয়াবহ মন্দা চলছে। যে বাজার কখনো কখনো সাময়িকভাবে ভালো হলেও বেশিরভাগ সময় কাটে মন্দায়। এতে করে বাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতেই হিমশিম খেতে হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বিলুপ্তও হয়ে গেছে। কেউ কেউ ভালো কিছুর আশায় লোকসান দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে আয় করার জন্য সরকার বিএসইসি প্রতিষ্ঠা করেনি। কোন আয় না হলেও বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতনাদি পাবেন। তারপরেও বিএসইসি যেভাবে নিজের আয়ের প্রতি আগ্রহী, সেটা ঠিক না। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির উচিত ফি কমিয়ে বাজার মধ্যস্থাতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা।
জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জরিমানা, ফি ও লাইসেন্সিং থেকে আয় কমায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মোট আয়ের পরিমাণ ১৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে কার্যকর ব্যয় ব্যবস্থাপনার কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি তাদের নিট উদ্বৃত্ত ১২ শতাংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এই তথ্য উঠে এসেছে বিএসইসির সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, জরিমানা ও ফি থেকে কমিশনের আয় গত বছরের তুলনায় ৩২ শতাংশ কমে ৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকায় নেমেছে। অন্যদিকে অন্যান্য উৎস থেকে আয় সামান্য কমে ৬৫ কোটি ৩২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আয় হ্রাস সত্ত্বেও বিএসইসি ব্যয় কমিয়ে এই ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছে; মোট ব্যয় ২১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭৫ কোটি ৮২ লাখ টাকায় নেমেছে। মূলত বেতন, ভাতা ও প্রশাসনিক খাতে খরচ কমানোর মাধ্যমে এই সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে ২০২৫ অর্থবছরের শেষে কমিশনের নিট উদ্বৃত্ত ২৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং মোট সম্পদ ৪৯৮ কোটি ৬০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
পুঁজিবাজারে মূলধন সংগ্রহেও বিএসইসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন যন্ত্রের মাধ্যমে মোট ৬ হাজার ১৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার মূলধন বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির ৩০৩ কোটি টাকার রাইটস ইস্যু, ১১টি কোম্পানির প্রাইভেট ডেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ৪ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা এবং ১৫টি কোম্পানির সাধারণ, বোনাস ও প্রেফারেন্স শেয়ার থেকে ১ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বাজারের শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএসইসি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ২২৬টি অভিযোগের মধ্যে ২২২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অনিয়ম শনাক্ত করতে ৯২টি তদন্ত ও ৬১০টি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এর ফলে ৯৮৭টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ হাজার ৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে ৫২৭টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে পুঁজিবাজারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিএসইসি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে বিতর্কিত সার্কিট ব্রেকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে এবং অধিকাংশ কোম্পানির ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়েছে। কমিশন আশা করে, বাজারচালিত মূল্যব্যবস্থা কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার স্থিতিশীল হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।



