আলমগীর হোসেন ও শহীদুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার খবরে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূচকের অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে। এতে প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর হারিয়েছে।

ফলে ডিএসইতে মূল্য সূচকে বড় পতনের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইতে লেনদেন শুরু হতেই আতঙ্কে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দেন। এতে লেনদেনের শুরুতেই ডিএসইর প্রধান সূচক ২২৩ পয়েন্ট কমে যায়। পরে কিছু ক্রেতা সক্রিয় হলে সূচকের পতন অব্যাহত থাকে। অবশ্য ক্রেতার থেকে বিক্রেতার চাপ বেশি থাকায় সূচকের বড় পতন দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএসইতে লেনদেন শুরুর পরপরই অধিকাংশ খাতের শেয়ারের দাম কমে যাওয়া সূচকের পতন আরো বেড়ে যায়। যৌথ হামলার খবরে আতঙ্কে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দেয়। ফলে সূচক পতনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এদিন ডিএসই ও সিএসইতে আগের কার্যদিবসের চেয়ে টাকার পরিমাণে লেনদেন কমেছে। একইসঙ্গে উভয় পুঁজিবাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম কমেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার খবরে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ফলে তারা শেয়ার বিক্রির চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন। হঠাৎ শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়া পুঁজিবাজারে সূচকে বড় পতন ঘটেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজার খুবই সেনসিটিভ। বিশ্বের কোন দেশে যখনই যুদ্ধ শুরু হয়, তার প্রভাব পুঁজিবাজারে খুব দ্রুত সময়ে পড়ে। অতীতেও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বিশ্বজুড়ে যেসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর প্রভাবও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে পড়েছে। এবারও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় পুঁজিবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। এই নেতিবাচক প্রভাব আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমন্বিত হামলায় ইতিমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিহত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই আঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অস্থির হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। বাড়তে পারে বিভিন্ন পণ্যের দাম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের যে নিরাপত্তাজনিত হুমকি ছিল, এর মধ্য দিয়ে তার অবসান হবে।

সেই সঙ্গে ইরানের জনগণ যে দীর্ঘদিন ধরে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন করছেন, তাঁদের সামনে সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। হামলার পর তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোয় উদ্বেগ বেড়েছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।

পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা দেখা যাক। মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংকট তৈরি হলে প্রথম যে শঙ্কা মানুষের মনে উঁকি দেয় সেটা হলো, তেলের দামের কী হবে। ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি।

হরমুজ প্রণালির ওপারে তেলসমৃদ্ধ আরব উপদ্বীপের মুখোমুখি অবস্থান এর। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, তাতে অবধারিতভাবেই তেলের দাম বাড়বে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১৩৮.৫৬ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৫ হাজার ৪৬১.৭০ পয়েন্টে। ডিএসই শরিয়াসূচক ২৬.৫৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮৯.৬৫ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ৫২.০৮ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ১১৭.৩৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

ডিএসইতে মোট ৩৮৯টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৩০টি কোম্পানির, কমেছে ৩৫৩টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৬টির। এদিন ডিএসইতে মোট ৭৭৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়ে ছিল ৯৪৭ কোটি ২৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৪৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩৫১ পয়েন্টে। সিএসইতে ১৬৪ টি কোম্পানি লেনদেনে অংশ নিয়েছে। এসব কোম্পানির মধ্যে ৩৩ টির দর বেড়েছে, কমেছে ১৩৭ টির এবং ১৪ টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে ১২ কোটি ৭৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।