পুঁজিবাজার ইস্যুতে তারেক রহমানের সংস্কার রূপরেখা দ্রুত প্রয়োজন
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: অর্থনীতির কঠিন একসময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন গত ১৭ বছরে নানা চড়াই-উত্রাইয়ে নিজেকে ‘শাণিত’ করা পরিণত এই রাজনীতিবিদ। তথ্য-উপাত্ত বলছে, তিনি এমন একসময় বাংলাদেশকে সাজানোর ক্ষমতা পেয়েছেন, যখন ব্যাংক খাত লুটপাটে পথহারা। দেশ চলছে ধারদেনায়। কোষাগারে কাঙ্খিত তহবিল নেই। বড় রাজস্ব ঘাটতি। একের পর এক কারখানা বন্ধের নোটিশ। উচ্চ সুদের ছোবলে বিনিয়োগ মন্দা। স্থবির কর্মসংস্থান।
ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হওয়ার কথা ছিল পুঁজিবাজার। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকের অপশাসন, লুটপাট ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চরম উদাসীনতায় তা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজার যে ভয়াবহ আস্থাহীনতা ও তারল্য সংকটে নিমজ্জিত, তা থেকে উত্তরণের জন্য কেবল গৎবাঁধা কিছু সংস্কার বা আশ্বাসের বাণী যথেষ্ট নয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রক্তপানি করা সঞ্চয় যখন মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর পকেটে চলে যায়, তখন শুধু একটি বাজারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং পুরো দেশের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাজারকে একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে আনা।
ফলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান দুর্দশা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৫৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই বাজারের গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বারবার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অকার্যকর ভূমিকার কারণে অস্থিতিশীল হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯-১০ সালের কৃত্রিম বুদবুদ এবং পরবর্তী সময়ে ২০১১-১৩ সালের ভয়াবহ ধস বিনিয়োগকারীদের আস্থায় যে ফাটল ধরিয়েছিল,
তা গত এক দশকেও মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট কিছু সিন্ডিকেট যখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ছিলেন কেবল বলির পাঁঠা। রাজনৈতিক প্রভাবে বিএসইসি-র (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি; বরং সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে প্রভাবশালী মহলের স্বার্থ রক্ষায়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালেও দেশের বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে কোনো সুখবর পায়নি। এ সময় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ১৬ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন আসে, যেখানে পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের পুঁজিবাজারে ৮৫ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন লক্ষ্য করা গেছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় যে আমাদের সমস্যাটি কেবল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার নয়, বরং এটি একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ও শাসনতান্ত্রিক সংকট।
২০২৪ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুঁজিবাজারে ক্রমাগত দরপতন ও লেনদেনের খরা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। ডিএসইএক্স সূচক ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে আসা এবং প্রতিদিন হাজার হাজার বিও হিসাব শূন্য হয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষ এই বাজারের ওপর থেকে পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রধান কারণ হলো পুঁজিবাজারে আইনের শাসনের অভাব। যখন একজন বড় কারসাজিকারী হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে পার পেয়ে যায়, আর একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে রাস্তায় বসে, তখন পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা ফিরে আসা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রথমেই এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। বিগত সরকারের আমলে পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থ পাচারের হাতিয়ার হিসেবে। এখন সময় এসেছে এই অলিগার্কিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের যে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা অর্জনে পুঁজিবাজারকে হতে হবে উন্নয়নের প্রধান ইঞ্জিন। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও শিল্পায়নের অর্থায়ন কেবল ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে সম্ভব নয়।
ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি করে। তাই দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের জন্য পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের জন্য কোনো বিকল্প নয়, বরং একটি জাতীয় প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতেহার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ স্লোগানের আওতায় পুঁজিবাজার সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে এখনই। এই ইশতেহারে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন ও পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে,
যা বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই কমিশনগুলোকে কেবল কাগুজে প্রতিষ্ঠান হিসেবে না রেখে এদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।



