স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: আইএফআইসি ব্যাংকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিনিয়োগ উপদেষ্টা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের নিয়ন্ত্রিত পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নতুন বোর্ড গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দেড় বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই বোর্ডের ওপর আবারও পর্যবেক্ষক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে প্রায় ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকের লুকানো বা নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত পুরোনো খেলাপি ঋণগুলো পুনরায় শ্রেণিবিন্যাস করা হলে এই উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।

মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছিলেন। ওই সময়ের ঋণগুলো খেলাপি হলেও নিয়মিতভাবে দেখানো হতো।

ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে আইএফআইসির খেলাপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আইএফআইসির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, বা ৫১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে সেপ্টেম্বর শেষে আইএফআইসির মোট ঋণ স্থিতি ৪৪ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা।

এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকে প্রশ্ন উঠেছে যে বোর্ড পুনর্গঠনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কথা ছিল, তার ওপরই কেন আবার পর্যবেক্ষক বসাতে হলো? কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ডের ব্যর্থতার কথা অস্বীকার করলেও খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতাই এ সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে।

তারা বলছেন, আইএফআইসি ব্যাংকে বিভিন্ন সময় ঋণ অনিয়ম, করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বলতা ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের অভিযোগ উঠলেও এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর এখন অবজারভার বসিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটা ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক আরও আগেই নিয়েছে। ব্যাংকের বোর্ডের সঙ্গে মিলে তারা কাজ করবে। ব্যাংকের বোর্ডের ব্যর্থতার কারণে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে কি-না? আর বোর্ড ব্যর্থ হলে ভেঙে না দিয়ে কেন পর্যবেক্ষক বসানো হলো-এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা বোর্ডের ব্যর্থতার বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মনে করছে পর্যবেক্ষক বসানো দরকার, এ জন্য বসিয়েছে। বিশেষ কোন কারণ নয়।

ব্যাংকে অবজারভার (পর্যবেক্ষক) দেওয়া হয় মূলত আর্থিক সূচকের অবনতি, সুশাসনের অভাব এবং অনিয়ম রোধ করে ব্যাংকের বোর্ডে নজরদারি জোরদার করার জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিযুক্ত এই পর্যবেক্ষকরা ঋণ অনুমোদন, আমানত ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বোর্ড সভায় উপস্থিত থাকেন।

সূত্রমতে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের (সংশোধিত) ৪৬ ধারার অধীনে আইএফআইসি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংক জনস্বার্থে বা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী বা ব্যবস্থাপনায় পর্যবেক্ষক বসাতে পারে। বিশেষ নির্দেশনায় আইএফআইসি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক হিসেবে কার্যক্রম তদারকি করবেন ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট-১-এর পরিচালক এ কে এম কামরুজ্জামান।

সূত্র জানায়, নিয়োগ পাওয়া এ কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অংশ নিয়ে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অংশ নেবেন। এর মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালন কার্যক্রম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক অবস্থার ওপর সরাসরি নজরদারি জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে গত ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একইসঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের পর্ষদ গঠন করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দায়িত্ব পালন নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তিনি নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের ব্যাংকটির গুরুত্বপূর্ণ ডিএমডিসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এতে ব্যাংকের খরচের খাতা ভারী হয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাও খারাপ হয়েছে।

গত বছর সেপ্টেম্বর শেষে (৯ মাসে) ব্যাংকটি বড় লোকসান করেছে। যদিও ২০২৪ সালের প্রথম ৯ মাসে মুনাফা করেছিল আইএফআইসি ব্যাংক। ব্যাংকটির তৃতীয় প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে আইএফআইসির কর-পরবর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা। যদিও ২০২৪ সালের একই সময়ে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় পুরো বছরের চিত্র এখনও পাওয়া যায়নি। তবে বছর শেষে ব্যাংকটির লোকসান আরও বাড়বে বলেই ধারণা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।