বিএসইসির বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ কী
স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে দিন পার করছেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা। প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রায় এক বছর পার হলো। এই সময়ে মাত্র একজনের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছে, বাকি ২০ কর্মকর্তার বিষয়টি এখনও সুরাহা হয়নি। বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করায় ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল এক আদেশে ২১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই বছরের ৫ মার্চ বিএসইসিতে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খল ঘটনায় এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় কমিশন।
এর পর এক বছর পেরিয়ে গেছে, বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের জীবন কাটছে চরম অনিশ্চয়তা আর অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। বিনা বিচারে দণ্ড নয় আইনের এই চিরাচরিত স্লোগান যেন বিএসইসির এই কর্মকর্তাদের জীবনে এক নিষ্ঠুর পরিহাসে পরিণত হয়েছে। এতদিন তারা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষা করেছেন। নতুন সরকারের কাছে তাদের দাবি ছিল তাদের মধ্যে যারা প্রকৃত দোষী তাদের শাস্তি দেন, কিন্তু বাকিদের কাজে ফিরে যাওয়ার সুযোগ চান তারা।
বিএসইসি কর্মকর্তাদের চাকরি এবং শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালিত হয় মূলত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০২১ অনুযায়ী। এই বিধিমালায় কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং দণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা ফৌজদারি মামলা রুজু হলে কমিশন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারে। সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন একজন কর্মকর্তা মূল বেতনের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) খোরাকি ভাতা পাবেন। তবে তিনি বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা পূর্ণ হারে পাবেন।
তবে বিধিতে সাময়িক বরখাস্তের কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সময়সীমা উল্লেখ না থাকলেও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীকে ৬০ দিনের বেশি সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত রাখা আইনত চ্যালেঞ্জযোগ্য। তবুও বিএসইসি প্রশাসন তদন্তাধীন ও জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে এই স্থগিতাদেশ লম্বা করে চলেছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিশনের পরিচালক আবু রায়হান মোহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার ফলে কর্মকর্তারা মূল বেতনের মাত্র ৫০ শতাংশ খোরাকি ভাতা পাচ্ছেন। ২০২৬ সালের বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই সামান্য অর্থে ঢাকা শহরের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো এক দুঃসহ সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা অর্ধেক বেতনে জীবনের ব্যয় মেটাতে পারলেও নিম্ন পদস্থ কর্মকর্তাদের জীবন সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির এক সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, সময় অনেক চলে গেছে আমরা মাসে অর্ধেক বেতন পাচ্ছি, কোনো মতে সংসার চলে যাচ্ছে কিন্তু যারা নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা তারা এই বেতন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। এই বেতনে সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, তাদের সন্তানদের টিউশন ফি, বয়স্ক মা-বাবার চিকিৎসা খরচ এবং দৈনন্দিন বাজার করতে গিয়ে অনেকেই এখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। শুধু তাই নয় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই বরখাস্ত তকমা গায়ে লাগায় আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে তারা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন।
বিএসইসির মতে, পুঁজিবাজারের সংবেদনশীলতা এবং নাশকতার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকায় তদন্তে কোনো তাড়াহুড়ো করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া জনবলের ঘাটতি থাকায় একই কর্মকর্তাদের একাধিক তদন্ত কমিটির দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে। তবে বিএসইসির এই কর্মকর্তাদের ভাগ্য এখন মূলত ঝুলে আছে তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।
একদিকে আইনি অধিকার, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয় এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে ২০টি পরিবার। নতুন সরকারের সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার রক্ষায় এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান হওয়া জরুরি। তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি যারা নির্দোষ তাদের সসম্মানে কাজে ফিরিয়ে আনাও প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতার জন্য অপরিহার্য। এই বিষয়ে বিএসইসির কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে সহকর্মীদের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হোক এমনটি তাদেরও প্রত্যাশা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপপরিচালক বলেন, অনেকেই আমাদের দীর্ঘদিনের সহকর্মী তাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তারা যখন সমস্যায় থাকে এটা নিজের কাছে কষ্টের মনে হয়। তবে বিষয়টি দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং নাশকতার অভিযোগে গত বছরের ৬ মার্চ শেরেবাংলা নগর থানায় ১৬ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তার আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
বিএসইসি অভ্যন্তরীণভাবে বিভাগীয় মামলা পরিচালনা করছে, যার ধীরগতির কারণে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। এদিকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অন্তত ৭ জন কর্মকর্তা হাইকোর্টের একটি পুরনো রায় (যাতে বলা হয়েছে সরকারি কর্মচারীকে ৬০ দিনের বেশি সাময়িক বরখাস্ত রাখা যাবে না) দেখিয়ে নিজ উদ্যোগে অফিসে হাজিরা দেওয়া শুরু করেছিলেন। তবে কমিশন তাদের এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেয়নি।
যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি নাশকতার বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বাধ্যতামূলক অবসর বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অপরাধ প্রমাণিত হবে না, তারা তিরস্কার বা লঘু দণ্ড নিয়ে চাকরিতে ফিরতে পারেন। তবে দীর্ঘ সময় পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের জোরালো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যদি নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়, তবে অনেক ক্ষেত্রে মানবিক কারণে বা অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে বরখাস্তদের বিষয়ে নমনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বরখাস্ত অবস্থায় থাকা বিএসইসির কর্মকর্তাদের মানবিক ও পেশাগত জীবন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকায় তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় বরখাস্ত থাকা কর্মকর্তাদের জন্য সামাজিকভাবে সম্মানহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।পদোন্নতি বন্ধ থাকা এবং কর্মপরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত দক্ষতা ও ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়েছে।
দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সংস্কারমুখী সরকারের আগমনে এই কর্মকর্তাদের মনে আশার আলো জেগেছে। তাদের দাবি, আমরা দোষী হলে শাস্তি দিন, কিন্তু বিনা বিচারে ঝুলিয়ে রাখবেন না। বিগত সময়ের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কেউ বরখাস্ত হয়েছেন কি না, তা যাচাই করতে একটি নিরপেক্ষ রিভিউ সেল গঠনের দাবি তাদের। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর নয়, তাদের তদন্ত চলাকালীন অন্তত দাপ্তরিক কাজে ফেরার সুযোগ দেওয়ারও আহবান তাদের। মাসের পর মাস ফাইল আটকে না রেখে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিভাগীয় মামলা শেষ করাও দাবি উঠেছে।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি একজন মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে দীর্ঘসময় ছিনিমিনি খেলা সুশাসনের পরিপন্থী। নতুন সরকারের সংস্কার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই কর্মকর্তাদের ভাগ্যে দেখা যাওয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়াকে কেন্দ্র করে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের দাবিতে ৫ মার্চ ৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে। ৬ মার্চ বিএসইসির ১৬ কর্মকর্তাকে আসামি করে মামলা করেন বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত গানম্যান আশিকুর রহমান।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে এবং কমিশনার মো. মহসিন চৌধুরী, মো. আলী আকবর ও ফারজানা লালারুখের উপস্থিতিতে কমিশনের নির্ধারিত সভাকক্ষে সভা চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাসহ আরও কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশনের সভাকক্ষে জোরপূর্বক ও অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন। এরই মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কমিশনের মূল ফটকে তালা দেন, সিসি ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই, কমিশনের লিফট বন্ধ করে দেন এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করে মারাত্মক অরাজকতা ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন।
বিএসইসির সাময়িক বরখাস্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন: বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম, পরিচালক আবু রায়হান মো. মোহতাছিন বিল্লা, অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম, যুগ্ম পরিচালক রাশেদুল ইসলাম, উপপরিচালক বনী ইয়ামিন, আল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও তৌহিদুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক জনি হোসেন, রায়হান কবীর, সাজ্জাদ হোসেন ও আবদুল বাতেন, লাইব্রেরিয়ান মো. সেলিম রেজা বাপ্পী,
ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু ইউসুফ। এর বাইরে রয়েছেন পরিচালক আবুল হাসান ও ফখরুল ইসলাম মজুমদার, অতিরিক্ত পরিচালক মিরাজ উস সুন্নাহ, উপপরিচালক নান্নু ভূঁইয়া, সহকারী পরিচালক আমিনুর রহমান খান, তরিকুল ইসলাম ও সমির ঘোষ। সূত্র: বাংলানিউজ



