স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক খাতের পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাগির হোসেন খানের বিরুদ্ধে নতুন করে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি যখন চরম আর্থিক সংকটে ছিল তখনই এমডি তার ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঘুষ দেওয়া এবং বিলাসী জীবনযাপনে কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করেছেন।

ফলে শেয়ারহোল্ডারা পুঁজি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করলেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাগির হোসেন খানের লুটপাট বন্ধ নেই। এছাড়া বর্তমানে জরাজীর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্য পিপলস লিজিং এন্ড ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড অন্যতম। পি কে হালদার কাণ্ডে আলোচিত পিপলস লিজিং এর প্রায় সাত হাজার আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কোম্পানি কোর্টের তত্ত্বাবধানে পিপলস লিজিং পরিচালিত হলেও, বর্তমান এমডি এবং বোর্ডের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এই দুই আইনী সংস্থাকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এখনও কিছু ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এমডি বহাল তবিয়্যতে রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেন অন্যতম।

সূত্রমতে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ও পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন এই সগীর হোসেন। কুষ্টিয়ায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে নিজেকে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন বলেও জানা যায়।

তবে সরকার পরিবর্তন হলেও একই বোর্ড একই এমডি নিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। জনগণের আমানতের টাকা জনগণকে ফেরত দেওয়ার কর্মকান্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকলেও সেই টাকা ইচ্ছেমতো অপচয় করার অভিযোগ উঠেছে এমডি সাগীর হোসেন ও তার আজ্ঞাবহ কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এরই ধারাবাহিকতায় পল্টন থানায় দায়েরকৃত জুলাই হত্যা মামলা নং ২৬ তাং ১৬/০৩/২০২৫ এর অন্যতম আসামি পিপলস লিজিং এর এমডি সাগীর হোসেন, কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকির নিজেদের নাম ওই মামলা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করতে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ প্রদান করেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

জানা যায় যে বিষয়টি সেপ্টেম্বর ২২,২০২৫ তারিখের অফিস নোট পিএলএফ/অফিস নোট/এমজি/এফসি/২০২৫ তে পল্টন থানার মামলা নং ২৬, ১৬/৩/২০২৫ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। উক্ত অফিস নোটে এমডি সাগীর হোসেন সহ মোট ১৪ জন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন। পিপলস লিজিং চরম আর্থিক দুর্বল অবস্থায় থাকলেও মাত্র ৪৫ জন কর্মী নিয়ে চলা প্রতিষ্ঠানটির এমডি মাসিক বেতন নিচ্ছেন প্রায় ৫ লাখ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানির অর্থ থেকে ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনার জন্য প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা থেকে রেহাই পেতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঘুষ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা, শেয়ারহোল্ডার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব অনিয়মের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত পিপলস লিজিংয়ের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০২১ সালের ২৯ জুন বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডকে পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেন। আমানতকারীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সব পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে একটি বিশেষ বোর্ড গঠন করে। সেই বোর্ডের অধীনেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আদালতের নির্দেশনা ও কোম্পানি আইনের বিধান উপেক্ষা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বর্তমান এমডি সাগির হোসেন খান। কোম্পানির আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত বোর্ড সভা ডেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব সভা অনেক সময় রাজধানীর ফাইভ স্টার হোটেলে আয়োজন করা হয় এবং বোর্ড সদস্যরা এতে অংশগ্রহণের জন্য মোটা অঙ্কের সম্মানী নেন।

এছাড়া কোম্পানির গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, ব্যক্তিগত মামলা ব্যয়কে কোম্পানির মামলা দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করেছেন, কোম্পানির আর্থিক সংকটের মধ্যেও এসব কর্মকাণ্ডের কারণে আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।

ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে সাগির হোসেন খানের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি মামলায় নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ পেতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বরে একটি অফিস নোটে মামলা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। ওই নথিতে এমডি সাগির হোসেনসহ মোট ১৪ জন কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেন।

জানা গেছে, ওই অর্থের চেক ইস্যু করা হয় আব্দুল্লাহ আল মাহফুজের নামে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি (আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ) চেক ইস্যুর বিষয়টি স্বীকার করলেও থানায় টাকা দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আমার চাকরি অল্পদিন হলো স্থায়ী হয়েছে। আমি ছোট মানুষ, এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। এছাড়া ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট করা আরেকটি অফিস নোটে ‘স্পেশাল তদবির’ শিরোনামে রমনা থানাসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ম্যানেজ করার জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিল অনুমোদনের কথাও উল্লেখ রয়েছে। ওই বিল অনুমোদন করেন এমডি সাগির হোসেন খান ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট একটি চেকের মাধ্যমে ড্রাইভার বেলালের নামে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, আইন বিভাগের সাবেক এক কর্মকর্তার একটি মামলায় তদবির করার জন্য এই টাকা দেওয়া হয়েছিল। ড্রাইভার বেলালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে থানায় টাকা দেওয়া হয়েছিল কিনা-এ প্রশ্নের জবাবে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

এছাড়া একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পিপলস লিজিংয়ের কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের নামে ৫ লাখ টাকার একটি চেক ইস্যু করা হয়। ওই অর্থ তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, বর্তমানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে কনসালট্যান্সি ফি হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে অফিস নোটে উল্লেখ রয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে আশিকুর রহমান বলেন, কোম্পানির একটি মামলার বিষয়ে পরামর্শের জন্য এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। তবে আমানতকারীদের অর্থ এভাবে ব্যবহার করা যায় কি না-এ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি।

এছাড়া বিভিন্ন কর্মকর্তার নামে বিপুল অঙ্কের অগ্রিম অর্থ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোম্পানির এক হিসাবে দেখা গেছে, কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকিরকে ৬০ লাখ ২০ হাজার টাকা, শেখ রেজওয়ান উদ্দিনকে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনকে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা, সাইফুল ইসলামকে ৬ লাখ টাকা, ফখরুল ইসলামকে ৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, মোক্তাফ হোসেনকে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, আব্দুল্লাহ আল মাহফুজকে ১২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা এবং আশিকুর রহমানকে ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নামে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছে; যার মোট পরিমাণ প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি। এরই মধ্যে পল্টন থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে সাগির হোসেন খানের। মামলা নম্বর ৩৮০/২০২৪ অনুযায়ী তিনি ওই মামলার ৮৪ নম্বর আসামি।

একই মামলায় পিপলস লিজিংয়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিভিন্ন অজুহাতে তিনি কোম্পানির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে পিপলস লিজিংয়ের এমডি সাগির হোসেন খানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ব্যক্তিগত অপরাধে জড়িত হলে সেই মামলার ব্যয় তাকে নিজস্ব তহবিল থেকেই বহন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে এ ধরনের ব্যয় বহনের কোনো সুযোগ নেই। আরিফ হোসেন খান বলেন, কেউ যদি ব্যক্তিগত মামলার খরচ প্রতিষ্ঠানের অর্থ থেকে দেন, তবে তা গুরুতর অনিয়ম। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, অতীতে এসব বোর্ড সভায় প্রায় সব সদস্যই উপস্থিত থাকতেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কয়েকজন বোর্ড সদস্য দেশ ছেড়ে চলে গেছেন বা আত্মগোপনে রয়েছেন। পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে আমানতকারীদের জমা রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের আমানত প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত না পাওয়ায় অনেক আমানতকারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা বিপুল পরিমাণ ঋণ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদারের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালের মে মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তিনি প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এমডি সাগীর হোসেন খান তার কার্যকালের মেয়াদ বাড়াতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন। জনগণের আমানতের টাকার সঠিক সুরক্ষা ও যথাযথভাবে তা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সাগীর হোসেন এর মত দুর্নীতিবাজদের অপসারণ সহ তাদের সঠিক বিচারের মুখোমুখি করার দাবি ভুক্তভোগীদের। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মহলের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সহ সংশ্লিষ্টরা।