স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও মন্দার প্রভাব পড়েছে দেশের রপ্তানি খাতে। দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের খাত তথা পোশাক রপ্তানি টানা আট মাস ধরে কমছে। মার্চে রপ্তানি কমে যাওয়ার হার আগের আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছর রপ্তানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের ধাক্কার মাধ্যমে এ খাতে নেতিবাচক পরিস্থিতির শুরু হয়। মুলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, প্রধান বাজার ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে। গত বছরের চেয়ে এই মার্চ মাসে রপ্তানি কম হয়েছে ১৯ শতাংশ। আর গত ৯ মাসে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছে ২৭৮ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক। আর গত বছরের মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩৪৪ কোটি ৯৯ লাখ ২০ ডলার। একক মাস হিসেবে এ বছর মার্চ মাসে রপ্তানি কম হয়েছে ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। যা আগের বছরের চেয়ে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম।

তথ্য বলছে, দুই ধরনের তৈরি পোশাক নিট ও ওভেনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ২১ দশমিক ২০ শতাংশ। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ, ৯ মাসের রপ্তানি আয়কে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ৯ মাসে মোট রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ৮৫৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানির এই বড় হ্রাসের পেছনে বহুমুখী (মাল্টিপল) সমস্যা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তবে রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার পেছনে যুদ্ধ বেশি সংকট তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, আপাতত বড় যুদ্ধ হিসেবে হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ চলছে। কিন্তু আগে থেকেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ইউরোপ জুড়ে তৈরি পোশাকের বাজারে মন্দা তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তা চলমান আছে। এ কারণে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব আগে থেকেই পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হরমুজ প্রণালীর সংকট আরও ঘনীভূত করেছে।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, অনেকদিন আগে থেকেই ইউরোপে সংকট তৈরি হয়ে আছে। এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল কিন্তু নতুন করে যুদ্ধ ঘুরে দাঁড়াতে দিচ্ছে না, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সমস্যা রয়ে গেছে; যুদ্ধের কারণে বায়ারদের কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতি হিসাব-নিকাশ করছে বা কার্যাদেশ দিচ্ছে না এবং স্টকগুলো শেষ করার চেষ্টা করছে। সবকিছু মিলিয়ে এই মার্চে এমন একটা সমস্যা হয়েছে।

মার্চে রপ্তানি আয় হ্রাসের পেছনে ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা ও ঈদে আটদিনের লম্বা ছুটিও কাজ করেছে বলে মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্ট থেকে রপ্তানি হ্রাস শুরু হয়েছে।

আগস্টে সংকোচন হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ; সেপ্টেম্বরে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ; অক্টোবরে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ; নভেম্বরে ৫ শতাংশ; ডিসেম্বরে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ; জানুয়ারি মাসে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি সংকোচন হয়েছে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ।