মো. আবদুল মান্নান, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বেশ কিছু সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি স্পষ্ট হলেও দেশের পুঁজিবাজার ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। সরকার বদলের পর নতুন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে এমন প্রত্যাশা ছিল বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পুঁজিবাজারে সূচক ও লেনদেন মাঝে মধ্যে কিছুটা উত্থান দেকা দিলেও তা স্থায়ী হচ্ছে। ফলে উঠছে স্বাভাবিক প্রশ্ন অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তখন পুঁজিবাজার কেন পিছিয়ে?

এদিকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও দেশের পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের কাঙ্খিত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এর মধ্যে আমাদের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এই পশ্চাৎপদতা মূলত কাঠামোগত।

দীর্ঘদিন ধরে ভালো মানের কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিনির্ভরশীলতা, ফিক্সড ইনকাম বা সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব বাজারে তারল্য সংকট ও আস্থার ঘাটতিকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রিজার্ভের উন্নতি এবং রাজনৈতিক উত্তরণ পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সংকীর্ণ কিন্তু অর্থবহ সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুঁজিবাজারের টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি। তার জন্য কাঠামোগত বাধাগুলো দূর করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বাজার উন্নয়নের পথ সুগম করতে হবে।

এছাড়া পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং আস্থার সংকটে ভুগছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অধীনে এই সংকট যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিনিয়োগকারীদের একাংশের মতে, এই কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো বাজার পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে বরং ধ্বংসের পথকে ত্বরান্বিত করছে। ফলে পুঁজিবাজার এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

পুঁজিবাজারের প্রাণ হলো বিনিয়োগকারীর আস্থা। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেই আস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডিএসইএক্স সূচকের বড় পতন, বাজার মূলধনের হ্রাস এবং হাজার হাজার খুচরা বিনিয়োগকারীর বাজার ত্যাগ—সবই এই আস্থাহীনতার প্রতিফলন। বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিগত অসঙ্গতি, হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং বাজার বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধিমালা তাদেরকে বাজার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০২৫ এবং মার্জিন রুলকে তারা ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য মিউচ্যুয়াল ফান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এটি বিনিয়োগের বৈচিত্র্য আনে এবং ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু নতুন বিধিমালার কিছু ধারা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে বিতর্কিত ধারা হলো: যদি কোনো ফান্ডের বাজারমূল্য তার নিট সম্পদমূল্যের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে যায়, তাহলে সেই ফান্ড বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা কমিশন পাবে। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘কালো আইন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ: বাজারমূল্য কখনো সম্পদ ব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, বৈশ্বিক বাজারে এমন নিয়মের নজির নেই, এটি হাজার হাজার কোটি টাকার মূলধন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সমস্যার সমাধান নয়, বরং পুরো খাতকে শাস্তি দেওয়ার মতো একটি সিদ্ধান্ত। নতুন বিধিমালায় দেখা যাচ্ছে: ট্রাস্টি ও কাস্টোডিয়ানের ফি কয়েক গুণ বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ফি বৃদ্ধি, অথচ সম্পদ ব্যবস্থাপকের ফি কমানো। এই বৈপরীত্য শিল্পের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ: দক্ষ পেশাজীবীরা এই খাতে আসতে অনাগ্রহী হবে, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে, ছোট ফান্ড ব্যবস্থাপকরা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ফলে পুরো মিউচ্যুয়াল ফান্ড শিল্পই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সমালোচকদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো: নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পুঁজিবাজার বিষয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার অভাব। ব্যাংকিং খাত থেকে আসা নেতৃত্ব বাজারের জটিলতা, বিনিয়োগকারীর মনস্তত্ত্ব এবং সেকেন্ডারি মার্কেটের গতিশীলতা যথাযথভাবে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে: নীতিমালা বাস্তবতার সাথে খাপ খাচ্ছে না, বাজারে অপ্রত্যাশিত অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে।

কমিশনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবের অভিযোগও বারবার উঠে আসছে। এতে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা হারাচ্ছে এবং সিদ্ধান্তগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে। এমনকি কমিশনের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে নৈতিকতা ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উপর বিশ্বাস কমে গেলে পুরো বাজারই দুর্বল হয়ে পড়ে এটাই এখন বাস্তবতা।

নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি কমে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা। আইপিও খরা পুঁজিবাজারকে স্থবির করে দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগের সুযোগ না থাকলে বাজারে তারল্য কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারায়। একই সঙ্গে শিল্পায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারের ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৬৪ হাজার বিনিয়োগকারী বাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয় এটি একটি সতর্ক সংকেত। কারণ: খুচরা বিনিয়োগকারীরা বাজারের ভিত্তি, তাদের প্রস্থান বাজারের গভীরতা কমিয়ে দেয়, আস্থার সংকট আরও বাড়ায়।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি: ১. নীতিমালার পুনর্মূল্যায়ন: বিতর্কিত ধারা বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। বিশেষ করে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সংক্রান্ত নিয়মগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

২. দক্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা: পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞ ও পেশাদার ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনতে হবে। ৩. আস্থা পুনর্গঠন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ৪. পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি: ইটিএফ, কমোডিটি ফান্ড, ডেট ফান্ডসহ নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালু করতে হবে। ৫. আইপিও বাজার সক্রিয় করা: ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে প্রণোদনা দিতে হবে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে এটি হতে পারে শিল্পায়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি, আর ভুল পথে চললে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ভয়াবহ ক্ষতির ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। বর্তমান বাস্তবতা বলছে সংস্কার এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি জরুরি প্রয়োজন। নীতিগত স্থিতিশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে পুঁজিবাজারের এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা।