স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: ‘ইতিহাসের সেরা আইটেম এই মাত্র পেলাম ইনবক্স করুন’, ‘এক সপ্তাহে ডাবল হবে’, ‘অল্প কিছু টাকার বিনিয়োগ পাল্টে দিতে পারে আপনার জীবনটাই, পেতে ইনবক্স করুন’ এবং ‘ব্লক সেল করতে চাইলে ইনবক্স করেন’ এভাবে ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে স্ট্যাটাস দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করছে শেয়ারবাজার নিয়ে কারসাজি করা চক্র।

আইটেম দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কয়েকটি চক্র। এই চক্রের কবল থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের রক্ষায় মাঠে নেমেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরেই গুজবনির্ভর বিনিয়োগ, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানো এবং বিভিন্ন কারসাজি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে সম্প্রতি এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে। ‘নিশ্চিত লাভ’, ‘গোপন তথ্য’, ‘বিশেষ শেয়ার’, ‘লোকসানের ঝুঁকি নেই’ এ ধরনের আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি সংগঠিত চক্রের বিরুদ্ধে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, বর্তমানে পুঁজিবাজারে একটি নতুন শব্দ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘আইটেম’। এর মাধ্যমে এমন কিছু শেয়ারের নাম প্রচার করা হয়, যেগুলোর দাম অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে দাবি করা হয়। বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে এসব তথাকথিত আইটেম সরবরাহ করা হয় এবং সদস্যদের বিশ্বাস করানো হয় যে, বাজারের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বড় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া বিশেষ তথ্যের ভিত্তিতেই এসব সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত লাভের আশায় থাকা বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হচ্ছে এ ধরনের কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে গ্রুপ পরিচালনাকারীরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখেন। আবার কখনও বাজারসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নাম ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করেন। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।

তদন্তে জানা গেছে, কিছু গ্রুপে যোগ দিতে সদস্যদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থও নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের পরিমাণ অনুযায়ী সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ করা হয়। বিনিময়ে দেওয়া হয় তথাকথিত বিশেষ শেয়ারের তথ্য, যেগুলোতে বিনিয়োগ করলে বড় মুনাফা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। এমনকি লোকসানের আশঙ্কা নেই বলেও দাবি করা হয়।

একটি গ্রুপের পরিচালকের সঙ্গে বিনিয়োগকারী পরিচয়ে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে সদস্য হলে নিয়মিত ‘আইটেম’ দেওয়া হবে। তার দাবি, এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করে সদস্যরা উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করছেন।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তিনি কথোপকথনের এক পর্যায়ে দাবি করেন যে বাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের ‘নিজস্ব লোক’ রয়েছে এবং সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে পরে সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে ওই ব্যক্তি পূর্বের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। তিনি জানান, কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তথ্য নয়, বরং নিজেদের বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই শেয়ারের সুপারিশ দেওয়া হয়। আগে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি আর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রতারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো শুরুতে অনেক ক্ষেত্রেই কিছু বিনিয়োগকারী লাভ করতে পারেন। কারণ একটি নির্দিষ্ট শেয়ার নিয়ে একযোগে প্রচারণা চালানো হলে সেখানে স্বল্প সময়ের জন্য ক্রয়চাপ তৈরি হয়। ফলে দাম বাড়তে শুরু করে। এই বাড়তি মূল্য দেখে নতুন বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন এবং বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেন।

কিন্তু একসময় যারা প্রচারণা চালিয়েছিলেন, তারাই বেশি দামে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। তখন ক্রেতাদের হাতে থেকে যায় উচ্চমূল্যে কেনা শেয়ার, যার দাম দ্রুত কমে যায়। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে এ ধরনের কৌশলকে সাধারণত ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ নামে চিহ্নিত করা হয়। প্রথমে কৃত্রিমভাবে কোনো শেয়ারের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা হয়, এরপর দাম বাড়ার সুযোগে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এখনও কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ব্যবসার সক্ষমতা, আয়, সম্পদ বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশ্লেষণ না করেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যকে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই সত্য বলে ধরে নেন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্রগুলো।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজারে শতভাগ লাভ কিংবা ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ বলে কিছু নেই। যে কোনো বিনিয়োগের সঙ্গেই লাভ ও লোকসানের সম্ভাবনা থাকে। তাই কেউ যদি নিশ্চিত মুনাফা বা লোকসানহীন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সেটিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই। কেউ যদি এমন ঘটনার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক এই প্রতারণা মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষার প্রসার এবং সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মুনাফার একমাত্র পথ হলো তথ্যভিত্তিক ও মৌলভিত্তিক বিনিয়োগ। দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ছড়ানো তথাকথিত ‘আইটেম’ কিংবা গোপন তথ্যের ফাঁদে পা দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই। তাই শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্রে গুজব নয়, যাচাইকৃত তথ্য ও কোম্পানির প্রকৃত অবস্থাকেই গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।