আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের বীমা খাতে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের সংকট আরও গভীর হয়েছে। বীমা খাতে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধের পথে হাঁটছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। সেই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে আইন সংশোধনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে চলতি বছরের মার্চ শেষে জীবন ও সাধারণ বীমা মিলিয়ে গ্রাহকদের মোট ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

এর মধ্যে এককভাবে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছেই আটকে আছে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবি, যা মোট বকেয়ার প্রায় ৪৩ শতাংশ। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত দাবিসংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকির ঘাটতির কারণে গ্রাহকদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট দাবির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৮১২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

এর মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৪০২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ফলে জীবন বীমা খাতে অনিষ্পন্ন দাবি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১০ কোটি ১২ লাখ টাকা। অন্যদিকে, ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানির অনিষ্পন্ন দাবি রয়েছে ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। দুই খাত মিলিয়ে মোট বকেয়া দাবির পরিমাণ ৭ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির মোট দাবি ছিল ৩ হাজার ৩৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে ৩ হাজার ৩১০ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবি এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে।

জীবন বীমা খাতের অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০৮ কোটি ৯ লাখ টাকা, প্রগ্রেসিভ লাইফের ১৫৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, জীবন বীমা করপোরেশনের ৬৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা, মেটলাইফ বাংলাদেশের ৬০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, ডেল্টা লাইফের ৫৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, গোল্ডেন লাইফের ৫৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, সানলাইফের ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং হোমল্যান্ড লাইফের ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার দাবি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

সাধারণ বীমা খাতেও বকেয়া দাবির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। মোট ৩ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবির মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বীমা করপোরেশনের অংশই ১ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ৩১৪ কোটি টাকা, প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের ১৭৫ কোটি টাকা এবং রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের ১৪৬ কোটি টাকার দাবি এখনও পরিশোধ হয়নি।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা পুরো বীমা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির পরও গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা বীমার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, নিয়মিত দাবি পরিশোধে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরবে না।

এ বিষয়ে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বকেয়া দাবি পরিশোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দুর্বল কোম্পানিগুলোর সম্পদ নগদায়ন, কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভালো ব্যাংকে থাকা স্থায়ী আমানত, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিক্রিযোগ্য জমি ও অন্যান্য বিনিয়োগ নগদায়নের মাধ্যমে দাবি পরিশোধের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।