দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দেশের নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়ে ধীরগতি এবং নানা আর্থিক অনিয়মের কারণে খাতটিতে খেলাপি ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে আমানতকারীদের আস্থা কমায় তারল্য সংকটেও পড়েছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। ফলে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সময়মতো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের এনবিএফআইগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওভারডিউ বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪৩২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ দশমিক ৬ শতাংশই এখন আদায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে এনবিএফআই খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৩৫৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২ সালের মার্চ প্রান্তিকে এনবিএফআই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে খাতটির খেলাপি ঋণ ছিল ১৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণমানের অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের অভিযোগ রয়েছে। পরিচালকদের প্রভাব, নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ আদায় হচ্ছে না। এতে একদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অন্যদিকে আয় কমে গিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ তৈরি হচ্ছে। করোনার সময় ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় এ খাতের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্বলতার তথ্য প্রকাশ্যে আসতে থাকলে আমানতকারীদের একটি অংশ টাকা তুলে নিতে শুরু করে। এতে তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অন্তত ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ সময়মতো ফেরত দিতে পারছে না। এর মধ্যে রয়েছে: পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)।

এসব প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের ঘটনায় আলোচনায় আসে সাবেক ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের নাম। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা একাধিক প্রতিষ্ঠানও পরে আর্থিক সংকটে পড়ে।

এনবিএফআইগুলোর ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় যেমন কমছে, তেমনি খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজনও বাড়ছে। এতে মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে আমানতকারীরা অর্থ ফেরত নিতে চাইলে সেই চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে নতুন করে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিএফআই খাতের সংকট সমাধানে শুধু তারল্য সহায়তা বা নতুন অর্থের জোগান যথেষ্ট নয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ঋণ আদায়ে জোরালো উদ্যোগ, সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠন বা একীভূত করার উদ্যোগও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ঋণ আদায় বাড়ানো এখন এনবিএফআই খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।