পুঁজিবাজারে টানা দরপতনে তীব্র হচ্ছে আস্থার সংকট
আলমগীর হোসেন, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: টানা দরপতনে ন্যুব্জ দেশের পুঁজিবাজার। ফলে দিন যতই যাচ্ছে পুঁজিবাজারের হাহাকার ততই বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ মানেই লোকসান। ফলে মাসুদ কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার ৫ মাস অতিবাহিত হলেও এখন আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। বরং আস্থা বিনিয়োগকারীদের যেটুকু ছিল তাও সংকটে পড়েছে।
ফলে দিন দিন বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে মাসুুদ খানের নেতৃত্বে গঠিত বিএসইসির নতুন কমিশন ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার ও কৃত্রিম হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালুর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও ৫ মাসে আস্থা ফেরাতে পারেনি পুঁজিবাজার। ফলে মাসুদ কমিশনের উপর ক্ষোভ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের।
তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার ও নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এর ওপর ভর করে কিছুটা গতি ফিরেছিল দেশের পুঁজিবাজারে। তবে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন বাস্তবে না ঘটায় এখন বাজারে দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। টানা দরপতনের পাশাপাশি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) প্রধান সূচক ৪৯ পয়েন্টের বেশি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট তীব্র হচ্ছে। আবারও পুঁজি হারানোর আতঙ্ক পেয়ে বসেছে বিনিয়োগকারীদের।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাজারের বর্তমান দুর্বলতার পেছনে একাধিক মৌলিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ডিএসইর অযোচিত হস্তক্ষোপ, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদহার, শিল্প-কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া, লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম এবং বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ঘাটতি অন্যতম।
তারা বলছেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, ভালো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদে অর্থায়নের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে বাজারে টেকসই উত্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে বাজারে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয় পুঁজিবাজার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা আরও প্রকট হয়। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক পুঁজিবাজার বিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে বিনিয়োগকারীদের মারাত্মক আস্থার সংকটে খাদের কিনারায় চলে যায় পুঁজিবাজার। ডিএসইর প্রধান সূচক পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। দীর্ঘ মন্দার প্রভাবে চলতি বছরের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্টে যায়, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে একপর্যায়ে সূচকটি ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টের ওপরে উঠে আসে।
তবে সম্প্রতি আবারও বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। অব্যাহত পতনের মধ্যে পড়ে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৪৮২ পয়েন্টে নেমে গেছে। এর মধ্যে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে কমেছে ৪৯ পয়েন্ট। এমন বড় পতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে আস্থার সংকটের কথা দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচিত। তবে মাসুদ কমিশন ৫ মাসেও পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে পারেনি। এছাড়া শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। অনেকে এই কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার বিচার হয়নি। পুঁজিবাজারে গতি আনতে হলে কারসাজিতে জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তেমনি পুঁজিবাজার ইস্যুতে দ্রুত বাজারবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে হবে।



