govt-bsecএইচ কে জনি, দেশ প্রতিক্ষণ, ঢাকা: দ্রুত উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর বিনিয়োগের জন্য চাই আর্থিক সামর্থ্য বা পুঁজির সহজ লভ্যতা। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ইচ্ছে করলেই প্রয়োজনীয় পুঁজির যোগান নিশ্চিত করতে পারে না। তাই তাদের পুঁজির জন্য বিদেশি উদ্যোক্তাদের উপর নির্ভর করতে হয়। তবে বিদেশি উদ্যোক্তারা তা হচ্ছে পুঁজির নিরাপত্তা এবং উচ্চ হারে মুনাফা অর্জনের নিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

আর তাই বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য প্রতিটি দেশই যথাসম্ভব সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। অধিকাংশ দেশই বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য নীতিমালা এমনভাবে প্রণয়ন করে থাকে যাতে নিজ দেশের উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়। ঠিক তেমনি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিদেশি বিনিয়োগের নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রায় চার বছরেও এর বাস্তবায়ন থমকে আছে।

পুঁজিবাজারে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারেন বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে তারা বলেন, পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে। নিঃসন্দেহে এটা পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু নীতিমালা না থাকার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ইচ্ছে করছেন একযোগে বিনিয়োগ তুলে নিতে পারবেন কিংবা নেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণটা অনেক বেশি হবে। তাই অবিলম্বে এ আইন বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানান তারা।

জানা গেছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাসহ সামগ্রিক পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর বিদেশি বিনিয়োগের নীতিমালার প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দীর্ঘ অতিবাহিত হলেও এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কোন দেশ কি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারবে, বিনিয়োগের কি পরিমাণ উত্তোলন করতে পারবে, বিনিয়োগের লকইন সংক্রান্ত নিয়মাবলী ইত্যাদি কার্যাবলীর জন্য বিএসইসির ৪৬২তম কমিশন সভায় পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যেগ গ্রহন করে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম ও পরিচালক মো. মাহাবুবুল আলমকে নির্দেশ দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

দুই সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটিকে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিশন সময় বেঁধে দেয় বিএসইসি। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রায় চার বছরেও বেশি সময় অতিবাহিত হতে চললেও বিদেশি বিনিয়োগের নীতিমালা প্রস্তুত করা হয়নি। এক্ষেত্রে এ নীতিমালা প্রণয়ণ করতে কালক্ষেপন করা উচিত নয় বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, গত মে মাসে শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নীতিমালা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়।  ওই সময় তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আগামী মাসের মধ্যে নীতিমালা তৈরির বিষয়টি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে। ফলে তথ্য-প্রযুক্তি ছাড়াও অন্যান্য খাতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। কাস্টডিয়ান ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। বিদেশী মিউচ্যুয়াল ফান্ড সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদন সাপেক্ষে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। তবে আমাদের পুঁজিবাজারে ইটিএফ অথবা বিদেশী মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।

বর্তমানে সুইস-প্রো নামের একটি বিদেশী ফান্ড ম্যানেজার রয়েছে। দেশের পুঁজিবাজারে এ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। মানসম্মত কোম্পানির অভাব ও বাজার মূলধন ছোট হওয়ার কারণে দেশীয় পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ কম।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশি পোর্টফোলিওতে শেয়ার ক্রয় বেড়েছে অনেক বেশি। আলোচ্য সময়ে বিদেশি পোর্টফোলিওতে শেয়ার ক্রয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৯২ কোটি ১৩ লাখ টাকার। যা ২০১৫ সালের একই সময়ে ছিলো ২ হাজার ৭৭৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার। সেই হিসাবে আলোচ্য সময়ে শেয়ার ক্রয় বেড়েছে ৭১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার বা ২৫.৮৪ শতাংশ।

২০১৫ সালে প্রথম ৯ মাসে শেয়ার বিক্রির চেয়ে ৮১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার শেয়ার বেশি কিনেছিলেন বিদেশিরা। বিক্রির চেয়ে কেনার হার ছিলো ৩.০৩ শতাংশ বেশি। তবে চলতি বছরে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২১ শতাংশে। আলোচ্য সময়ে বিদেশিরা ৫৮৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার বিক্রির চেয়ে বেশি কিনেছেন।

বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ১১.৩৭ শতাংশ। আর ২০১৪ সালের শেষ তিন মাসের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশী বিনিয়োগ নিবন্ধন হ্রাসের হার ৭৩.৫৩ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বিনিয়োগ নীতিমালা না থাকার অভাবে এখনো বিনিয়োগ সংক্রান্ত কোনো দিক নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে অন্যদিকে কোনো প্রকার বাঁধা না থাকায় ইচ্ছেমতো অর্থ উত্তোলন করছে বিদেশিরা। এতে ভালোর চেয়ে মন্দের পাল্লা বেশি হয়।

২০১০-১১ সালে পুঁজিবাজারে মহাধসের এটি একটি অন্যতম কারণ হিসেবে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগের কোনো নীতিমালা না থাকায় মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। তবে পরবর্তীতে এ ধরণের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, বর্তমানে শেয়ারের দর যে পর্যায়ে রয়েছে তা খুবই আকর্ষণীয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট না হওয়ার কোনো কারণ নেই। এছাড়া বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোও ভালো পর্যায়ে রয়েছে। সেই সঙ্গে রিজার্ভের পরিমাণও ভালো পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণে বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আসলে তা সার্বিক অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।

এজন্য নিয়মানুযায়ী বিদেশি বিনিয়োগ আসলে পুঁজিবাজার গতিশীল হবে। তাই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উপর নির্ভরশীল না হয়ে নীতিমালা মেনে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার বিমুখ হলে  সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজার ধরে রাখতে পারে না। সে কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করা দরকার বলে মনে করেন তারা।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত ও বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে সবার জন্য সমান নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৈদেশিক বিনিয়োগকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার বানানোর জন্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা ও আইনি কাঠামোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ব্যাংকের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনারও পরামর্শ দেন তারা।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক প্রেসিডেন্ট ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে বিএসইসি। কারণ নীতিমালা না থাকলে যে কেউ সহজে বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়ে যেতে পারবে। এক্ষেত্রে কোন দেশ কি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে ওই নীতিমালায়।